হাইপোথাইরয়েডিজম সম্পর্কে ৬ টি কল্পকথা যা আমি ৭ বছর ধরে এর সঙ্গে বসবাস করে শিখেছি

lead image

কল্পকথা - ১ : থাইরয়েড আপনার ওজন বাড়ায়!

যদি আমার মতো আপনারও থাইরয়েডের সমস্যা হয়ে থাকে তাহলে সম্ভবত বেশ কিছু লোক আপনাকে ইতিমধ্যেই বলেছে যে এবার আর আপনার ওজন কমবে না এবং সারাজীবন কুমড়োপটাশ হয়েই থাকতে হবে! ঠিক?

এবার যদি আমি আপনাকে বলি যে এটা সত্যি নয়? হ্যা, তাই। আমার হাইপোথাইরয়েডিজম নির্ণিত  হয়েছিল যখন আমি সন্তানের জন্য চেষ্টা করছিলাম এবং আপনি এটা বিশ্বাস করবেন না যে থাইরয়েড আমাকে গর্ভধারণ করতে দিচ্ছিল না। থাইরয়েড এবং উর্বরতার সমস্যা বিষয়ে আমার আগের পোস্টে আলোচনা করা হয়েছে।

আজ আমার মেয়ে ৬ বছর বয়সী এবং গত ৭ বছর ধরে থাইরয়েডের সাথে বসবাস করার পর আমি এই রোগের সাথে জড়িত অনেক কল্পকথা ও মিথ্যা গল্প শুনেছি। এখানে আমি আপনার সাথে সর্বাধিক প্রচলিতগুলি নিয়ে আলোচনা করব।

১। আপনার ওজনের ওপর আপনার কোনও নিয়ন্ত্রণ থাকবে না

এটি একটি চরম মিথ্যা এবং সত্যি কথা বলতে কি আমিও শুরুতে এটা বিশ্বাস করেছিলাম। কিন্তু কয়েক বছর সংগ্রাম করে, বই পড়ে এবং বিশেষজ্ঞদের সাথে আলোচনা করে আমি জানতে পারলাম যে জীবনশৈলী ঘটিত আর পাঁচটা রোগের মতোই থাইরয়েডও স্বাস্থ্যকর জীবনশৈলী মেনে চললে অনায়াসে নিয়ন্ত্রণ করা যায়।  

 

src=https://www.theindusparent.com/wp content/uploads/2017/08/post pregnancy weight.jpg হাইপোথাইরয়েডিজম সম্পর্কে ৬ টি কল্পকথা যা আমি ৭ বছর ধরে এর সঙ্গে বসবাস করে শিখেছি

"সঠিক ওষুধ গ্রহণ করে হাইপোথাইরয়েডিজম কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে। সকালে হাঁটা এবং সূর্যালোকে হালকা ব্যায়াম পেশীগুলি সঞ্চালিত করে এবং আপনার ত্বকে সকালের রোদ পড়লে শরীর প্রাকৃতিক উপায়ে ভিটামিন ডি তৈরি করে নেয়। যথাসময়ে ওষুধ খাওয়া, স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া এবং প্রথম সূর্যের আলোয় ব্যায়াম করাই হচ্ছে আপনার ওজনের সমস্যা নিয়ন্ত্রণ করার চাবিকাঠি," বলেন বৈকল্পিক ঔষধ চিকিৎসক ডঃ জোনাথন ডিসুজা।

ওজনের ক্ষেত্রেও ওই একই ব্যাপার। আপনার ওজন বাড়ার সঙ্গে হাইপোথাইরয়েডিজম এর কোনও সম্পর্ক নেই। যদি আপনি নিয়মিত পরীক্ষা করান এবং প্রেস্ক্রাইবড ডোজে ওষুধ খান, তাহলেই ওজন বাড়া নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন।

তাই, যদি আপনি কোনও কারণে ব্যায়াম করা বন্ধ করে থাকেন, তাহলে আমি বলব যে অবিলম্বে আবার শুরু করুন। আর যদি ভাবছেন যে এটা করা সম্ভব নয় তাহলেও চিন্তা করবেন না, এরও উপায় আছে। শুধু একটি স্বাস্থ্যকর ডায়েট অনুসরণ করে আর নিয়মিত ব্যায়াম করে আমি আমার মেয়ের জন্মের ৬ বছর পর ১৬ কিলো ওজন কমিয়েছি।

২। যখন ইচ্ছে আপনার ওষুধের ডোজ বন্ধ করতে পারেন

থাইরয়েডের ওষুধের সঠিক ডোজ নির্ধারণই প্রধান চাবিকাঠি আর সেটা থাইরয়েড প্রোফাইল রক্ত পরীক্ষা টি ৩, টি ৪ এবং টিএসএইচ করিয়ে একজন থাইরয়েড বিশেষজ্ঞকে দিয়ে বিশ্লেষণ করিয়েই করা যেতে পারে।

একবার ডাক্তারের কাছ থেকে সঠিক ডোজ পাবার পর সাধারণত প্রথম দু'বার ছ'মাস অন্তর এবং তারপর বছরে একবার করে রক্ত পরীক্ষা করিয়ে ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

থাইরয়েডের ওষুধ খালি পেটে খাওয়া উচিত এবং একঘন্টা অপেক্ষা করে কিছু খাওয়া উচিত।

প্রতিবার রক্ত পরীক্ষা করাতে গিয়ে, ঘটনাচক্রে যদি কখনও দেখেন যে আপনার রক্তে টিএসএইচ এর মাত্রা কমে গেছে, তাহলেও কিন্তু আপনি আপনার ইচ্ছে মতো ওষুধ বন্ধ বা ডোজ কম করতে পারেন না। সর্বদা মনে রাখবেন যে এটা শুধু মাত্র একজন ডাক্তারই করতে পারেন এবং এরকম ডাক্তার, যিনি থাইরয়েড ব্যাধি চিহ্নিত ও চিকিৎসা করার জন্য উপযুক্ত যোগ্যতাসম্পন্ন।

৩। আপনি চিকিৎসার পরামর্শের জন্য যে কোনও ডাক্তারের কাছে যেতে পারেন

এই বিষয়ে একজন সাধারণ চিকিৎসক বা যে কোনও ডাক্তারের কাছে গেলে আপনার ভালোর চেয়ে ক্ষতিটাই বেশী হবে। যদি আপনি আমার মত হাইপোথাইরয়েডিজমে ভুগছেন, তাহলে আপনাকে শুধুমাত্র থাইরয়েড রোগ বিশেষজ্ঞের কাছেই যেতে হবে, যাঁরা এন্ডোক্রিনোলজিস্ট বলেও পরিচিত।

হাইপো বা হাইপারথাইরয়েডিজম হচ্ছে অন্তঃস্রাব গ্রন্থিগুলির একটি ব্যাধি এবং যখন প্রথাগত চিকিৎসাতে ঠিকমতো কাজ হয় না তখন শুধুমাত্র একজন বিশেষজ্ঞ, যিনি হরমোনের বিষয়গুলি ভালভাবে অধ্যয়ন করেছেন, একমাত্র তিনিই সর্বোত্তম সম্ভাব্য চিকিৎসা করতে পারেন।

তাঁরা একজন পারিবারিক ডাক্তার বা সাধারণ ডাক্তারের মতো নন, একজন এন্ডোক্রিনোস্টোলজিস্ট হরমোন এবং হরমোনের রোগের বিষয়ে গভীর পড়াশোনা করেন কাজেই একথা বলা নিষ্প্রয়োজন যে একমাত্র তাঁরাই পারেন আপনার রোগ বিশ্লেষণ করে আপনাকে সর্বোত্তম সম্ভাব্য চিকিৎসা প্রদান করতে।

৪। আপনার খাদ্য তালিকায় বাঁধাকপি অন্তর্ভুক্ত করা উচিত নয়

বাঁধাকপি অবশ্যই একটি ক্রাসিফেরাস সব্জী এবং অনেকে বলে যে যদি আপনার হাইপোথাইরয়েডিজম সনাক্ত হয়েছে তবে এটি আপনার খাদ্য থেকে সম্পূর্ণ বাদ দেওয়া উচিত। যাইহোক, কিছুদিন অন্তর একবার, ধরুন, ১৫ দিনে এক-দু'বার বাঁধাকপি খেলে আপনার কোন ক্ষতি হবে না।

src=https://www.theindusparent.com/wp content/uploads/2015/05/raw food e1432002084969.jpg হাইপোথাইরয়েডিজম সম্পর্কে ৬ টি কল্পকথা যা আমি ৭ বছর ধরে এর সঙ্গে বসবাস করে শিখেছি

"বাঁধাকপি খেয়ে হাইপোথাইরয়েডিজম বেড়ে যাওয়ার ব্যাপারে শুধুমাত্র সীমিত তথ্য বিদ্যমান। বাঁধাকপিতে বেশ কয়েকটি স্বাস্থ্যগত উপকারিতা আছে যা হাইপোথাইরয়েডিজম বেড়ে যাওয়ার সম্ভাব্য অনুমানের চাইতে বেশী গ্রহণযোগ্য। যে সালফার ঘটিত যৌগ বাঁধাকপিতে থাকে, যার জন্য এর একটি বিশিষ্ট গন্ধ আছে, সেটি ক্যান্সারের বিরুদ্ধে সুরক্ষা দেয়। উপরন্তু, ১ কাপ কাঁচা কাটা বাঁধাকপিতে থাকে ২২ ক্যালোরি, ৩২ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি এবং ২২ গ্রাম ফাইবার," জনপ্রিয় অনলাইন স্বাস্থ্য পত্রিকা লাইভ স্ট্রং এর একটি রিপোর্ট জানাচ্ছে। বলা বাহুল্য, যদি আপনি ওজন কমানোর চেষ্টা করছেন, তাহলে বাঁধাকপি্ সর্বোত্তম শব্জী, যা খাওয়া যেতে পারে।

"এছাড়া, ভিটামিন ডি এর অল্পতাও থাইরয়েড গ্রন্থিকে প্রভাবিত করে। ভিটামিন ডি সমৃদ্ধ খাবার যেমন চীজ, মাশরুম, স্যালমন বা টুনার মতো ফ্যাটি মাছ, ডিমের কুসুম এবং লিভার খেলেও সঠিক পরিমাণ ভিটামিন ডি পেতে সাহায্য করবে," ডঃ জোনাথন আরও বলেন।

৫। যদি আপনার থাইরয়েডের সমস্যা থাকে তবে আপনি তা জানতে পারবেন

আট বছর আগে, আমি্ অভূতপূর্ব ভাবী ওজন বাড়িয়ে চলেছিলাম, কিন্তু ভারতে আর সবার মতো আমিও ভেবেছিলাম (মিডিয়াতে থাকার সুবাদে) যে এটা হচ্ছে কারণ আমার সবে বিয়ে হয়েছে আর আমার অসংযত জীবনযাপন।

দুঃখের বিষয়, অনেক রোগের মত, হাইপোথাইরয়েডিজম এরও বেশ কয়েকটি লক্ষণ রয়েছে যা কদাচিৎ লক্ষ্য করা যায় যেমন ওজন বৃদ্ধি, অলসতা এবং ক্লান্তি।

হাইপোথাইরয়েডিজিমের জন্য ওজন বৃদ্ধির কিছু গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ হতে পারে; আপনার আংটি আর আপনার আঙ্গুলে ঢুকবে না, আপনার জামাকাপড় টাইট হবে এবং বক্ষদেশ থেকে ফেটে পড়ার উপক্রম হবে এবং আরো গুরুত্বপূর্ণ আপনার মুখ এবং চোখ, বিশেষ করে, প্রতি সকালে ফোলা দেখাবে।

সেইভাবেই, গত দু'দিন পার্টি করার জন্য যদি আপনি ক্লান্ত হন তবে ঠিক আছে। কিন্তু যদি আপনি এমনিই আলস্য বোধ করেন এবং বাড়ির পাশের মলে একবার পরিক্রমা করেই ক্লান্তি বোধ করেন তবে এটি একটি শক্তিশালী লক্ষণ হতে পারে।

৬। থাইরয়েডের ওষুধ বাদ দিয়ে জীবনশৈলীতে পরিবর্তন এনে এটি সারানো সম্ভব

আমরা সাধারণত অনেক টিভি চ্যানেলে দেখি যে জীবনশৈলী ঘটিত রোগগুলি আপনার দৈনন্দিন জীবনে কয়েকটি পরিবর্তন এনে নিয়ন্ত্রিত হতে পারে।

আমি তাদের সাথে একমত, তবে, এর মানে এই নয় যে জীবনশৈলীতে পরিবর্তন করেছেন বলে আপনি আপনার ওষুধ বন্ধ করে দিতে পারবেন। কখনও না. আপনার ডোজ কখনোই পরিবর্তন করবেন না আর আপনার থাইরয়েডের ওষুধ আপনার ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া বন্ধ করবেন না।

সর্বদা মনে রাখবেন, স্বাস্থ্যকর জীবনশৈলী কখনোই একটি পছন্দের ব্যাপার হওয়া উচিত নয়, এটি জীবন ধারণের একটি পথ হতে হবে, ঠিক যেমন আপনাকে শ্বাস নিতে হয় বা খাদ্যগ্রহণ করতে হয়। সঠিক ব্যায়াম এবং খাওয়া নিশ্চিতভাবে আপনার হাইপোথাইরয়েডিজম নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করবে।

আমার এবং আমাদের পাঠকদের সঙ্গে ভাগ করার মতো অনুরূপ কোনও অভিজ্ঞতা যদি আপনার আছে, সেটা আমরা শুনতে চাই! কমেন্ট বক্সে আপনার চিন্তা লিখে পাঠান।