ভারতের চাকুরীরতা মায়েরা প্রতিদিন যে ৫ টি চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হন

lead image

কর্মক্ষেত্রে আপনি একটি দলের নেত্রী বা একটি পরিকল্পনার মাথা হতে পারেন কিন্তু বাড়ী ফিরলেই আপনি এমন একজন, যিনি সব কিছুর জন্যই দায়ী!

এর মুখোমুখি হওয়া যাক, ভারতীয় মা'দের প্রতিদিন নানা চ্যালেঞ্জের মোকাবেলা করতে হয় এবং যদি আপনি চাকুরীরতা মা হন তাহলে আপনার সমস্যা হয় দ্বিগুণ!

এরকম হবার কারণ হচ্ছে যে কর্মরতা মায়ের ব্যাপারটা এখনও অনেকে বোঝেন না।

অতএব, কর্মক্ষেত্রে আপনি একটি দলের নেত্রী বা একটি পরিকল্পনার মাথা হতে পারেন কিন্তু বাড়ী ফিরলেই আপনি এমন একজন, যিনি সব কিছুর জন্যই দায়ী!  এর সাথে যদি শ্বশুর-শ্বাশুড়ি, দেওর-ননদ সহ বিস্তৃত পরিবারের আপনার কাছে প্রত্যাশা যোগ করেন তাহলে প্রায় প্রতিদিনই আপনাকে যুদ্ধক্ষেত্রে লড়তে হবে।

বিশ্ব ব্যাংকের এক বিশিষ্ট সমীক্ষাতে দেখা গেছে যে ভারতে ১৫ বছরের বেশী বয়সী নারী জনসংখ্যার মাত্র ২৭% কর্মরতা।  এটি ব্রিক্স অন্তর্ভুক্ত দেশগুলির (ব্রেজিল, রাশিয়া, ইন্ডিয়া, চায়না এবং সাউথ আফ্রিকা) মধ্যে  শ্রমশক্তিতে নারীদের অংশগ্রহণের সর্বনিম্ন হার, যেখানে চীনের হার ৬৪%, যা সর্বোচ্চ।

এর কারণ কি হতে পারে?  যদি আপনি আমাকে জিজ্ঞাসা করেন, আমি বলব যে ভারতীয় কর্মরতা মা'দের এমন সব অগনিত সমস্যার মুখোমুখি হতে হয় যা তাঁদের লক্ষ্যচ্যুত করে এবং অনিচ্ছাসত্বেও তাঁদের শেষ পর্যন্ত চাকুরী ছেড়ে বাড়ীতে বসে থাকা মা হয়ে যেতে হয়। ভারতের একজন কর্মরতা মা হিসাবে আমি যে সব চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছি, সেগুলি এখানে লিখলাম :

১।  আপনাকে ক্রমাগত আপনার কর্তব্য মনে করিয়ে দেওয়া হয়

ভারতীয় নারীদের প্রতিপালন করার সময়ই তাদের মনে গেঁথে দেওয়া হয় যে পরিবার এবং সন্তানদের দেখভাল করার জন্যই তাদের জন্ম হয়েছে।  কাজেই যদি আপনার অফিসে খুব জরুরী কোনো মিটিং থাকে আর আপনার বাচ্চা অসুস্থ হয়ে পড়ে, আপনাকে বাচ্চার পরিচর্যা করতে হবে কারণ সেটাই আপনার প্রাথমিক দায়িত্ব - অফিসের কাজ নয়।
working

আর আপনি যদি নিজের বাচ্চাকে ডে-কেয়ারে পাঠান তাহলে আপনাকে অনবরত মনে করিয়ে দেওয়া হবে যে আপনি সন্তানকে অবহেলা করে স্বার্থপরের মতো আচরণ করছেন।

স্বীকার করা যাক, বিয়ের পর প্রতি পদক্ষেপে নারীর পছন্দ-অপছন্দ গুলিকে বিচার করা হয়, কখন বাচ্চা হবে আর সে কিভাবে তার যত্ন নেবে।

যে সমস্ত নারীরা এই প্রথাগত নিয়মগুলি মানতে চায় না তাদের স্বার্থপর ও অহংকারী বলা হয়।  বাচ্চা হবার পরও যারা চাকুরী চালিয়ে যেতে চায়, তাদেরও এরকমই বলা হয়, এমনকি তথাকথিত শিক্ষিত পরিবারেও!

২। কাজের জায়গায় আপনাকে খাটো নজরে দেখা হয়

যত কাজেরই হোন না কেন, আপনি যদি তাড়াতাড়ি অফিস ছাড়েন এবং বাড়ীর কাজ বেশী করেন, আপনাকে সবসময় খাটো চোখে দেখবে, যে কারণে ভারতীয় কোম্পানিগুলিতে অনেক মা কে প্রধান ভুমিকা বা প্রজেক্ট দেওয়া হয় না।  আর যেহেতু খুব কম কোম্পানিতে নমনীয় কাজের সময় বা ক্রেশ এর ব্যাবস্থা থাকে, বহু নারীকে বাচ্চা হবার পর চাকুরী ছাড়তে হয়।

হয়তো এজন্যই দিল্লী আর তার আশেপাশে চাকুরী করা ১০০০ টি নারীর ওপর এক সমীক্ষা করে দেখা গেছল যে মাত্র ১৮-৩৪% বিবাহিত নারী বাচ্চা হবার পরও চাকুরী চালিয়ে গেছে।

ভারতে চাকুরীরতা মহিলাদের সমস্যার কথা আরও জানতে পড়ে চলুন

৩।আপনি বেশী রাতে ফিরতে পারেন না বা রাতের শিফট আছে এমন চাকরি নিতে পারেন না

চাকরি বেছে নেবার সময়ও ভারতের মা'দের সঙ্কুচিত চোখে হয় শিক্ষিকার কিংবা ৯টা থেকে ৬টার এমন চাকরি খুঁজতে হয় যাতে কম ঘোরাঘুরি আর বেশী টেবিলের কাজ।  আরও বিচিত্র যে কর্ম খালির বিজ্ঞপ্তিতেও এই মাণদন্ডের উল্লেখ থাকে।

আবার যখন আপনি ইন্টারভিউ দিতে যাবেন, আপনার ব্যাক্তিগত জীবন, পরিবার এবং বাচ্চাকে নিয়ে এমন প্রশ্নবাণ নিক্ষিপ্ত হবে যেন এইগুলিই একমাত্র আবশ্যক গুণাবলী যা আপনার নির্বাচিত হওয়া না হওয়া শ্তির করবে।

৪। বাচ্চা ছোট থাকার সময় আপনি বাড়ি থেকে কাজ করবেন বা সবেতন ছুটি নেবেন এমনটাই আশা করা হয়

বাচ্চা জন্মানোর পর পুনরায় চাকরিতে যোগ দেওয়া আর একটি সমস্যা।  সুবন্দোবস্ত ও নিরাপত্তা না থাকায় আপনার বাচ্চাকে এক সবসময়ের আগন্তুকের জিম্মায় রেখে আসা যথেষ্ট ঝুঁকির।   আশেপাশে নির্ভর করার মতো ভাল ডে-কেয়ার খুবই কম আছে।
working-mom

বলা বাহুল্য, ভারতীয় মায়েরা বাচ্চার ভালর জন্য আকর্ষণীয় চাকরিতেও ইস্তফা দিয়ে থাকেন।  বাড়ীতে থেকে কাজ এর সুযোগও খুবই কম আর যদিও আছে বেতন মোটেই তত লোভনীয় নয় যে আপনি করে যেতে উৎসাহ পাবেন।

৫। আশা করা হয় যে আপনি একটি অতি মানবীয় নারী

যদি আপনি পরিবারের অমতে চাকরি করছেন, আপনাকে একটি অতিমানবীয় ক্ষমতাসম্পন্ন নারী হতে হবে যে একা হাতে সবকিছু সামলাবে।

তাই, আপনার বাড়ি হোক বা আপনার সন্তানের প্রশ্নমালা, স্কুলে বার্ষিক অনুষ্ঠান বা একটি পারিবারিক বিয়ে; সর্বত্র আপনার উপস্থিতি অত্যন্ত আবশ্যক এবং এই ধরণের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কোনো ঘটনায়  যদি অনুপস্থিত থাকেন, আপনি একটি দায়িত্বহীণ মা যার কাছে আর সবকিছুর থেকে নিজের চাকরিটাই বড়।

আমি নিজেও এরকম পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছি কিন্তু ধন্যবাদ যে আমার এমন একটি স্বামী আছেন যিনি কাজের সমান ভাগ নেন।  দুঃখের বিষয়, অধিকাংশ ভারতীয় নারীদের এ সৌভাগ্য হয় না বা অদূর ভবিষ্যতে হবে এমন আশাও অতি ক্ষীণ।

Source: theindusparent