বাচ্চাদের খাদ্যে সংযোজন (অ্যাডিটিভ) কি ক্ষতিকর?

lead image

বাইরে মুদিখানা থেকে কেনাকাটা করার সময় আপনাকে বাচ্চাদের জন্য ক্ষতিকারক এই ৯ টি খাবারের অ্যাডিটিভ এড়াতে হবে। এগুলিতে তাদের স্বাস্থ্য কিভাবে প্রভাবিত হয় জানতে হলে পুরোটা পড়ুন।

শহরের অধিকাংশ ব্যস্ত মা-বাবার মতো যদি আপনি প্রক্রিয়াকৃত খাবার (প্রোসেসড ফুড) দিয়ে আপনার ভাঁড়ার ঘর ভরে রাখেন তাহলে আমরা আপনাকে আর একবার ভেবে দেখতে বলব। আপনি কি ভেবে দেখেছেন যে প্রক্রিয়াকৃত খাবারে বাচ্চাদের জন্য ক্ষতিকারক খাবারের অ্যাডিটিভ থাকে?

এই অ্যাডিটিভগুলিকে প্রক্রিয়াকৃত খাবারের আকার, রঙ, চেহারা এবং স্বাদ উন্নত করার জন্য ব্যবহার করা হয় বলে সাধারণত বর্ণনা করা হয়। যাইহোক, বাস্তবতা হল যে তাদের অধিকাংশই বিপজ্জনক, বিশেষ করে বাচ্চাদের জন্য।

খাবারের অ্যাডিটিভ কি বাচ্চাদের জন্য ক্ষতিকর?

বেশ কয়েকটি গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে খাবারের  শিশুর শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি করতে পারে। এইসব গবেষণাযর মোদ্দা কথা হল যে অ্যাডিটিভ মেশানো খাবার খাওয়ার ফলে বাচ্চাদের আচরণ বিগড়ে যাওয়া, বদরাগী মেজাজ, অতি সক্রিয়তা বা এমনকি ক্যান্সারও হতে পারে।

মাত্র কয়েক বছর আগে, ইউ কে সরকারের অর্থ সাহায্যে করা এক গবেষণায় বিজ্ঞানীরা দেখেছিলেন যে শিশুদের খাবার ও পানীয়গুলিতে ব্যবহৃত অ্যাডিটিভগুলির কারণে তারা বদমেজাজী হচ্ছে। গবেষকরা শিশুদের মধ্যে বিভ্রান্তিকর আচরণেরও একটি উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি লক্ষ্য করেছেন। এই গবেষণার পরে দেশের খাদ্য সংস্থা কয়েকটি নির্দিষ্ট প্রোসেসড ফুড এবং পানীয়ের উৎপাদন এবং বিক্রী নিষিদ্ধ করতে বাধ্য হয়।

দুর্ভাগ্যবশত, এইসব অ্যাডিটিভ এতরকম পণ্যে ব্যবহার করা হয় যে সেগুলিকে সম্পূর্ণভাবে বর্জন করা বাস্তবসম্মত তো নয়ই এমনকি সম্ভবও নয়।

তাই পরবর্তী সেরা বিকল্প হচ্ছে আসামী কোনগুলি, তা জানা।

বাচ্চাদের জন্য ক্ষতিকারক যে এই ৯ টি খাবারের অ্যাডিটিভ এড়িয়ে চলুন

food additives harmful

বেশিরভাগ ফাস্ট ম্যানুফ্যাকচারিং কনসিউমার গুডস (এফ এম সি জি) কোম্পানি তাদের তৈরী করা রেডি টু ইট খাবারে ফুড অ্যাডিটিভ সংযোজন করে। এইসব খাবার হল, সিরিয়াল, আইসক্রিম, ক্যান্ডি ক্রিস্পস, নরম পানীয় এবং 'প্রাকৃতিক' ফলের রস। মূলতঃ, সবরকম প্যাক করা খাবার।

সুতরাং কিভাবে আপনি অ্যাডিটিভ এড়াবেন? এর সমাধান হল সাবধানে লেবেলগুলি পড়া।

সৌভাগ্যবশতঃ, আমরা ইতিমধ্যেই আপনার জন্য ঘুরে ঘুরে এই বিরক্তিকর কাজটি করেছি। আমাদের কাছে ৯ টি খাবারের তালিকা আছে যা থেকে আপনাকে অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে। উপরন্তু, আমরা আপনাকে এটাও বলব কেন আপনার বাচ্চাদের এগুলিকে এড়িয়ে চলতে হবে।

  • কৃত্রিম সুইটেনার: এই উপাদানটি যে তালিকার প্রথমেই আছে, এতে আশ্চর্যের কিছু নেই! অধিকাংশ 'চিনি মুক্ত' ক্যান্ডি, নরম পানীয় বা কম ক্যালোরির পানীয়তে এক বা একাধিক অ্যাডিটিভ থাকে। লেবেলটি পড়ুন এবং দেখুন যে সেখানে স্যাকারিন, সোডিয়াম সাইক্লামেট, অ্যাসপার্টাম, অ্যাসোসালফেম-কে (অ্যাসোসালফেম পটাসিয়াম নামেও পরিচিত) এবং উচ্চ ফ্রুকটোস কর্ণ সিরাপ আছে কিনা। যদিও এই সমস্ত উপাদানগুলি নিরাপদ কিনা, সে বিষয়ে বৈজ্ঞানিক মহল বহুদা বিভক্ত তবুও কর্ণ সিরাপ যে মানুষকে মোটা করার জন্য দায়ী, সে ব্যাপারে সব গবেষকরাই একমত।
  • কৃত্রিম রং: এইগুলি রাসায়নিক রং যা খাদ্য এবং পানীয়কে রঙ্গীণ করে আর খাবারের অ্যাডিটিভকে ক্ষতিকারক করে তোলে। অতিরিক্ত রঙিন এবং ঝকমকে যে কোনো খাবার জিনিষ কেনার আগে, কি রঙ অ্যাডিটিভ আছে দেখে নিন। লেবেলে পড়ে দেখুন যে ব্লু 1, ব্লু ২, রেড 3, রেড 40, গ্রিন 3, হলুদ 5, হলুদ 6, এফডি অ্যান্ড সি লেকস (রংগুলির সংমিশ্রণ) এবং অরেঞ্জ বি (বেশিরভাগ সসেজ এবং হট ডগ কেসিং এ থাকে) আছে কিনা। বহুদিন থেকে সন্দেহ করা হয় যে বেশিরভাগ রঙের অ্যাডিটিভ বাচ্চাদের মধ্যে হাইপারঅ্যাক্টিভিটি বাড়ায়।
  • ট্রান্স ফ্যাট এবং আংশিকভাবে হাইড্রোজেনেটেড তেল: আপনি কি কখনও এই ভেবে আশ্চর্য হয়েছেন যে কতগুলো আচার এবং তেল ভিত্তিক খাবার কিভাবে এতদিন ধরে 'তাজা' এবং 'সংরক্ষিত' থাকে? এটি সম্ভব হয় আংশিকভাবে হাইড্রোজেনেটেড তেলের কারণে। যখন আপনার সন্তান এই ট্রান্স ফ্যাট খায়, তখন তার কম ঘনত্বের লিপোপ্রোটিন বা লো ডেনসিটি লিপোপ্রোটিন (এলডিএল) যা একটি খারাপ কোলেস্টেরল, তা বেড়ে যায় এবং তার শরীরের এইচডিএল (উচ্চ ঘনত্বের লিপোপ্রোটিন) যা একটি ভালো কোলেস্টেরল, তা কমিয়ে দেয়। গবেষণায় দেখা গেছে যে এর ফলে করোনারি হার্টের রোগ এবং ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ায়।
  • সোডিয়াম বেঞ্জোয়েট: এই সংরক্ষকটি নরম পানীয় এবং অম্লীয় খাদ্য যেমন, আচার ও প্যাকড সালাদে থাকে। এটি একটি প্রাকৃতিক রাসায়নিক হলেও, যখন ভিটামিন C এর সাথে মিলিত হয় তখন এটি একটি কার্সিনোজেন এ পরিণত হয় যা বেনজিন নামে পরিচিত। একটি গবেষণাতে শিশুদের অতিসক্রিয়তার সঙ্গে সোডিয়াম বেঞ্জোয়েট এর একটি সম্ভাব্য যোগসূত্র পাওয়া গেছে। এ কারণেই ডাক্তাররা প্রায়ই বাবা-মাকে বাচ্চাদের নরম পানীয় দিতে বারণ করেন। এটি শুধু চিনির জন্য নয়, সোডিয়াম বেনজোটেরও কারণে।
  • রাসায়নিক সংরক্ষক: বিএইচএ (বিউটিলেটেড হাইড্রোক্সিয়ানোসোল) এবং বিএইচটি (বিউটিলেটেড হাইড্রক্সাইটোলুইন) সহ রাসায়নিক সংরক্ষকগুলির জন্য আপনার চোখ খোলা রাখুন। অনেক কোম্পানি তেলকে অক্সিডাইজিং থেকে বাঁচাবার জন্য দুটোই ব্যবহার করে। প্রকৃতপক্ষে সাধারণত, সিরিয়াল, বেক করা খাবার, চিউইং গাম, শুকনো আলু, বিয়ার এবং এমনকি কিছু ফলের রসে বিএইচটি পাবেন। যাইহোক, উভয়কেই বিভিন্ন গবেষণায় ক্যানসারের সম্ভাব্য কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তারা শিশুদের স্নায়ুতন্ত্র, লিভার এবং কিডনি প্রভাবিত করে। তাই এই খাবারে অ্যাডিটিভটি মেশানো ক্ষতিকারক।
  • সালফাইটস: বিভিন্ন প্রক্রিয়াকৃত খাবারে পাওয়া আরেকটি সাধারণ সংরক্ষক হলো সালফাইট। এটি ফল এবং সবজিতে একটা নোনতা স্বাদ যোগ করে আর দোকানের তাকে অনেকদিন পর্যন্ত খারাপ না হতে সাহায্য করে। লেবেলে এগুলিকে সোডিয়াম সালফাইট, সালফার ডাইঅক্সাইড, পটাসিয়াম আর সোডিয়াম বাইসালফাইট, সোডিয়াম আর পটাসিয়াম মেটাবাইসালফাইট হিসাবে লেখা হয়। কিছু গবেষনায় দেখা গেছে যে এর ফলে বাচ্চাদের এবং প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে হাঁপানি হতে পারে। অতএব, সালফাইট বাচ্চাদের জন্য ক্ষতিকর অ্যাডিটিভ।
  • মোনোসোডিয়াম গ্লুটামেট (এমএসজি): এই অ্যাডিটিভ সাধারণত ইন্সট্যান্ট নুডলস, প্রসেসড মাংস, স্যুপ এবং মশলাতে পাওয়া যায়। এটি অনেক এশিয়ান রেস্টুরেন্টে ব্যবহৃত হয় বলে কুখ্যাত। যদিও এটি খাদ্য ও ঔষধ প্রশাসন কর্তৃক 'নিরাপদ' বলে অনুমোদিত হয়েছে, গবেষণায় দেখা গেছে যে এতে 'এমএসজি জটিল উপসর্গ ' হতে পারে। এই উপসর্গে, একটি শিশুর মাথাব্যাথা, বুকের ব্যথা, ঘাম, বমি বমি ভাব এবং এমনকি দুর্বলতাও হতে পারে।
  • পটাশিয়াম ব্রোমেট: এটি একটি অক্সিডেসিং এজেন্ট যা পাউরুটিতে ব্যবহৃত হয়। এটি ময়দার তাল কে শক্ত করে আর স্থিতিস্থাপকতা বাড়ায়। যাইহোক, গত বছরই ভারত সরকার খাদ্যের অ্যাডিটিভ হিসেবে পটাসিয়াম ব্রোমেট নিষিদ্ধ করেছে। সেন্টার ফর সায়েন্স এন্ড এনভায়রনমেন্ট (সিএসই) এর একটি গবেষণায় যখন দেখা গেল যে এতে অনেক ক্ষেত্রে ক্যান্সার হছে, তারপর এটা করা হল। স্বাভাবিকভাবে, এখন এটি একটি ক্যানসারকারক বলে লেবেল করা হয়েছে। যে মা-বাবারা এটা জানেন, তাঁদের সন্তানদেরকে এগুলি দেওয়া উচিত নয়।
  • ওলেষ্ট্রা: এবার একটি অতি বাস্তব জ্বলন্ত সমস্যা আসছে। আপনি যদি এখনও আপনার বাচ্চাদের পোটেটো চিপস খাওয়া বন্ধ না করে থাকেন, সম্ভবত আপনি এটি পড়ার পর করবেন। এই বিশেষ অ্যাডিটিভ চর্বির একটি  বিকল্প এবং দাবী করে যে প্রক্রিায়্কৃত খাবার থেকে চর্বি অপসারণ করে। যাইহোক, এই ওলেষ্ট্রা, যা আবার ওলীন নামেও পরিচিত, রিপোর্ট অনুযায়ী সেটি নাকি চরম বিপাকীয় সমস্যা যেমন, গ্যাস এবং ক্র্যাম্পের সমস্যার কারণ হতে পারে। অবশ্যই খাবারের অ্যাডিটিভ বাচ্চাদের জন্য ভাল নয়।

 

কোম্পানিগুলি যত প্রক্রিয়াকৃত খাদ্য প্রবর্তন করবে, মা-বাবাদের আরও বেশি সচেতন হওয়া প্রয়োজন। হাজার হোক, কেউ চান না যে তাঁদের সন্তান অতিসক্রিয়তা, বদমেজেজ, গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল সমস্যা, বা এমনকি স্ট্রোক এবং ক্যান্সার এর মতো অসুখে ভোগে।

তাই পরবর্তীকালে যখন আপনি সুপারমার্কেটের দিকে যাবেন, তখন নিশ্চিতই প্রতিটি লেবেল পড়ে দেখবেন। কিন্তু সেটাই সব নয়। আপনার বাচ্চাকে খাবারের অ্যাডিটিভ এর খাদের মধ্যে পড়ার হাত থেকে বাঁচাতে আপনার আরও কিছু করনীয় আছে।

কিভাবে আমি আমার সন্তানের ফুড অ্যাডিটিভ খাওয়া সীমিত করব?

  • একটি খাদ্য লগ প্রস্তুত করুন: আপনার বাচ্চাদের জন্য একটি খাদ্য ডায়েরি চালু রাখা নিশ্চিত করুন। প্রতি সপ্তাহে অন্তত ৫-৬ দিন সে কি খেয়েছে তা লিখে রাখুন। স্কুলে, ডে-কেয়ারে এবং বাড়িতে সে কি কি খেয়েছে তার একটি তালিকা তৈরি করুন। এটি আপনাকে প্রতি সপ্তাহে তার খাবারের মান পরীক্ষা করার সুযোগ দেবে যাতে আপনি তাকে অ্যাডিটিভ দেওয়া 'দ্রুত খাবার' পরিবেশন না করেন।
  • তাদের খাদ্য পরিবর্তন করুন: আপনার সন্তানের খাদ্যের মধ্যে আরও ভালো খাবার অন্তর্ভুক্ত করুন। এতে তাজা এবং সহজ খাবার রাখুন। যত পারেন সবজি এবং তাজা ফল দিন। নাস্তার জন্য প্রক্রিয়াকৃত খাবারের ওপর নির্ভর করবেন না। পরিবর্তে, সাধারণ ফলের সালাদ বা আপনার পছন্দ মতো তাজা স্যান্ডউইচ দিন।
  • লেবেলগুলি পড়ুন: এটি হল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ এবং যেটি সত্যিই একটি পার্থক্য তৈরি করবে। আমরা আপনার জন্য এই তালিকা বানিয়েছি, এটি দেখে অপ্রয়োজনীয় অ্যাডিটিভ এবং সংরক্ষক এড়িয়ে চলুন। এটি আপনার মোবাইলে এ সেভ করে রাখতে পারেন এবং যখন আপনি আপনার পরবর্তী শপিং এর জন্য যাবেন, এটি দেখবেন।
  • জৈব খাদ্যের লেবেলগুলি পরীক্ষা করুন: যদিও আপনি এটি করছেনই, তাই 'জৈব' খাবারের লেবেলগুলিও পরীক্ষা করবেন। তাদের মধ্যেও অনেকগুলিতে সংরক্ষক থাকে যা আপনার বাচ্চাদের জন্য ক্ষতিকারক হতে পারে। মনে রাখবেন, যে সব লেবেলে 'সম্ভাব্য নিরাপদ', 'এখনো পরীক্ষিত হওয়া বাকী' এবং সেইসাথে 'পরীক্ষার ফলাফল বিভিন্ন' লেখা থাকে, সেগুলি এখনও নিরাপদ বলে স্বীকৃত নয়।

তাই আপনার সন্তানের কি খাওয়া উচিত?

রঙ-মুক্ত আইসক্রিম এবং দই সহ সংরক্ষক-মুক্ত খাবার বেছে নেওয়াটা সুনিশ্চিত করুন। এবং নরম পানীয়ের পরিবর্তে বাচ্চাদের জল খেতে উৎসাহিত করুন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, যখনই মুদির দোকানে যাবেন এই তালিকা সঙ্গে রাখবেন।