প্রসবের সময় কাঁপুনি: প্রসবের আগেই এ সম্পর্কে জানা দরকার

আপনার সন্তানের প্রসব স্বাভাবিক হোক বা এপড্যুর‍্যাল হোক অথবা সি-সেকশন, সন্তানের জন্মের সময় আপনার কম্পনের অনুভূতি হবেই।

এই এখন, আপনার তৃতীয় ত্রৈমাসিকে, আপনি হয়তো সন্তান প্রসব সম্পর্কে যাবতীয় পড়াশোনা সেরে ফেলেছেন। সম্ভবত আপনি সেই বিরাট দিনটির জন্য সমস্ত ক্লাস করে প্রস্তুত হয়ে আছেন এবং  বাস্তব জীবনের প্রসব অভিজ্ঞতা জেনে নিজেকে শক্ত করেছেন। কিন্তু কোনও ক্লাস বা বই আপনাকে সন্তান প্রসবকালীন কাঁপুনির জন্য প্রস্তুত করতে পারে না।

হ্যাঁ, আপনি ঠিকই পড়েছেন। এরকমই একটি জিনিস আছে।

প্রায় সকল মহিলারা জন্ম পরিকল্পনা নির্বিশেষে বাচ্চার জন্মের সময় অদম্য কাঁপুনি বা ঝাঁকুনি অনুভব করেন।

তাই আপনার সন্তানের প্রসব স্বাভাবিক বা এপড্যুর‍্যাল অথবা সি-সেকশন, যাই হোক না কেন, সম্ভবত আপনি এই অপেক্ষাকৃত কম পরিচিত ঘটনাটির সম্মুখীন হবেন।

কিন্তু এতে চিন্তিত হবার প্রয়োজন নেই। এটি কোনোভাবেই আপনার বা আপনার সন্তানের কোনও ক্ষতি করে না।

শিশু জন্মের সময় কাঁপুনি: একটি সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক ব্যাপার

প্রসবকালীন কাঁপুনির কারণ আপনার হরমোনের চঞ্চলতা। হরমোনের মাত্রায় সূক্ষ্ম রদবদল হলেই শরীরে বিভিন্ন শারীরিক এবং মানসিক প্রতিক্রিয়া হয়। ঠিক ঠিক এই ব্যাপারগুলিই প্রসবের সময় ঘটে।

কেন সন্তান প্রসবের সময় ঝাঁকুনি-কাঁপুনি হয় তা বুঝতে হলে, প্রথমেই বুঝতে হবে যে কি পদ্ধতিতে কোনও শিশুর জন্ম হয়। সাধারণত, সক্রিয় প্রসবের তিনটি পর্যায় থাকে।

  • প্রথম পর্যায়: প্রকৃত প্রসব ব্যাথার সঙ্গে এই পর্যায়টি শুরু হয়। আপনি সংকোচন অনুভব করতে পারেন এবং প্রায় ১০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত প্রসারিত হতে পারে। এটি প্রসবের সক্রিয় অংশ এবং আপনার সংকোচন ৬০ থেকে ৯০ সেকেন্ড পর্যন্ত চলে নিয়মিত, দু'মিনিট অন্তর।
  • দ্বিতীয় পর্যায়: এই পর্যায়ে, আপনি আসল শিশুজন্মের অভিজ্ঞতা অর্জন করেন এবং শিশুকে প্রসব করেন। অথবা আপনাকে সীজারিয়ান করা হয়। অ্যানেস্থেসিয়া দেওয়া হোক বা না হোক, অনেক নারীরা এই পর্যায়ে বিবমিষা অনুভব করেন বা বমিও করেন। এটিই সন্তান প্রসবের সর্বাপেক্ষা কঠিন অধ্যায়।
  • তৃতীয় পর্যায়: তৃতীয় এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে আপনার গর্ভের ফুল (প্লাসেন্টা) বের হয়ে আসে। মূলতঃ শিশুটি একবার বেরিয়ে আসার পর, আপনার শরীর আপনার ভিতরের সবকিছুই বের করে দেয়।

এই তৃতীয় পর্যায়ের পর আপনার প্রসবকালীন কাঁপুনি হবে।

সাধারণতঃ, এটি শরীরের তাপমাত্রা পরিবর্তনের জন্য হরমোনের একটি অ্যাড্রেনালিন প্রতিক্রিয়া।

প্রক্রিতপক্ষে, পাবমেড এ প্রকাশিত একটি গবেষণাতেও বোঝা যায় যে এই কম্পনটি তাপমাত্রা এবং হরমোনের তারতম্য সহ অনেক কারণের উপর নির্ভরশীল।

"এই গবেষণায় প্রসবোত্তর কাঁপুনি-ঝাঁকুনিকে অতাপনিয়ন্ত্রণজনিত বলে নিশ্চিত করা হয়েছে। লেখকগণ অতাপনিয়ন্ত্রণজনিত ঘামের পরিচয় দিয়েছেন। এই তথ্যগুলি ইঙ্গিত দেয় যে, প্রসবোত্তর কাঁপুনি-ঝাঁকুনির কারণ বহুমাত্রিক," এই গবেষণা আরও জানিয়েছে।

প্রসবকালীন কাঁপুনির তীব্রতা কতটা?

shaking during childbirth

এটি কিন্তু আবার প্রতিটি মহিলার আলাদা আলাদা। এই কম্পন সাধারণত কয়েক সেকেন্ড থেকে কয়েক মিনিট পর্যন্ত স্থায়ী হয়। কিন্তু যেমন উল্লিখিত হয়েছে, প্রসবকালীন কাঁপুনির সঙ্গে সঙ্গে বেশিরভাগ মহিলা প্রসবজনিত অন্যান্য সাধারণ উপসর্গেও ভোগেন।

 

এর মধ্যে আছে ঠান্ডা লাগা কাঁপুনি এবং ঘাম, খিঁচুনি, বমি, কাঁপা বা কাঁদা।

অধিকাংশ ক্ষেত্রে, উষ্ণ স্নান বা উষ্ণ কম্বলের আচ্ছাদন এই কাঁপুনিকে নাটকীয়ভাবে কমিয়ে দেয়। এর ফলে পেশী শিথিল এবং স্নায়ু শান্ত হয়।

কখনও কখনও, ডিমেরোল মতো ওষুধ (একটি মাদকদ্রব্য) দেওয়া হয়। এটি কিন্তু শুধু বিরল ক্ষেত্রে এবং গাইনোকোলজিস্টের তত্ত্বাবধানে দেওয়া হয়।

প্রসবকালীন কম্পনের বৈজ্ঞানিক কারণ কি?

 

যদিও বৈজ্ঞানিকেরা এখনও প্রসবকালীন কম্পনের সঠিক কারণের ব্যাপারে একমত নন, তবে এই কারণগুলি শীর্ষ বলে বিবেচিত হয়।

১। ক্ষিপ্ত হরমোন

প্রসবকালে, ব্যাথা বাড়ানোর জন্য অক্সিটোসিন হরমোনের ইন্টারভেনাস ইঞ্জেকশন দেওয়া হয়। এই হরমোনটি দেবার উদ্দেশ্য হলো জরায়ুটি সঙ্কুচিত করা এবং রক্তপাত নিয়ন্ত্রণ করা।

এই হরমোনটি গর্ভাশয়ের সংকোচন করায় এবং অনেক সময় এমনকি পেশীও সংকুচিত করে যা অনেক নারী তাঁদের বাহুতে, পায়ে এমনকি পায়ের পাতার মধ্যেও অনুভব করেন।

সংকোচন ছাড়াও, এটি এপিনেফ্রাইন, কর্টিসোল এবং অ্যাড্রেনালিনের মতো হরমোনগুলিকে চাপ দেয়, যার ফলে নাটকীয়ভাবে শারীরিক তরলের তারতম্যের কারণে স্থানান্তরের ফলে প্রসবের সময় কম্পন হয়।

 

২। শ্রম

শিশুকে যোনিপথে ঠেলে বের করা একটি কঠিন কাজ। আপনার পুরো শরীর এই কাজটি সম্পন্ন করতে কাজ করে, আর তাই এতে ব্যাপক পরিশ্রম হয়। যখন আপনি শিশুকে ঠেলে বের করার জন্য চাপ প্রয়োগ করেন, তখন আপনার শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে যায়।

আপনার শিশুর জন্ম হয়ে গেলেই, শরীর বেড়ে যাওয়া তাপমাত্রা স্বাভাবিক করার চেষ্টা করে। এই তাপ নিয়ন্ত্রণ করার কারণে, আপনি কাঁপুনি এবং ঝাঁকুনি অনুভব করেন। এটি শরীরের স্বাভাবিক শারীরিক প্রতিক্রিয়া। কয়েক মিনিট বা ঘন্টার মধ্যেই আপনার এ থেকে পরিত্রাণ পাওয়া উচিত।

৩। রক্তের অসঙ্গতি

 

আরেকটি সাম্প্রতিক তত্ত্বে রক্তের অসঙ্গতির কারণে কাঁপুনি এবং ঝাঁকুনি হয় বলে বলা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে প্রসবের সময় ভ্রূণের রক্তের কিছুটা মায়ের রক্তপ্রবাহের সাথে মেশে।

তাই যদি মা এবং তাঁর নবজাত শিশুর রক্তের প্রকার আলাদা হয় -- উদাহরণস্বরূপ মায়ের যদি এ+ হয় এবং শিশুর এবি+ -- তাহলে শিশু জন্মের পর তিনি কম্পন, দাঁত-লাগা ও ঠাণ্ডা অনুভব করতে পারেন।

৪। আন্তঃধমনী তরল

কিছু ক্ষেত্রে, আন্তঃধমনী (ইন্টারভেনাস) তরল দেওয়া হলেও কিছু পরিমাণে কম্পন হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, যখন কোনও মহিলাকে প্রসবকালীন এপিড্যুর‍্যাল বা অন্য কোনও ড্রাগ দেওয়া হয়, তাতে ঠান্ডা লেগে কাঁপুনি বোধ করা সম্ভব।

এর কারণ, অধিকাংশ আন্তঃধমনী তরল আমাদের শরীরের তাপমাত্রার তুলনায় ঠান্ডা হয়। সুতরাং যখন এগুলি শরীরে ঢোকে, আপনার খুব ঠান্ডা লাগতে পারে।

৫। অ্যামনিয়োটিক তরল যোগাযোগ

প্রসবের প্রক্রিয়ায়, কখনও কখনও অ্যামনিয়োটিক তরল মায়ের রক্তের প্রবাহে প্রবেশ করে। সাধারণত, এটি সি-সেকশনের সময় ঘটে এবং স্বাভাবিক প্রসবের সময় হয় না। কিন্তু, তবুও এতে কিছুটা কম্পন হতে পারে।

 

৬। সংক্রমণ

কিছু ক্ষেত্রে, প্রসবের সময় মায়ের জ্বর হতে পারে। আপনার তাপমাত্রা ১০০ ডিগ্রি ফারেনহাইটের বেশি হলে, এটি সংক্রমণের ইঙ্গিত হতে পারে।

প্রসবের পর আপনার ডাক্তার আপনাকে ২৪ ঘন্টা নজরে রাখবেন। যদি তারপরও ১০০ ডিগ্রি থাকে এবং আপনি শ্রোণীদেশে বা স্তনএ ব্যথা অনুভব করেন, তবে ডাক্তার অবহিষ্কৃত টিস্যু, দুগ্ধগ্রন্থিতে বাধা এবং এমনকি স্তনপ্রদাহের কারণে সংক্রমণের রোগও নির্ণয় করতে পারে্ন।

যাইহোক, যদি আপনি মনে করে থাকেন যে জীবনে একবারই এটি সহ্য করতে হবে, তাহলে আপনি খুব ভুল ভেবেছেন।

 

আপনি কি প্রতিবারই প্রসবকালীন কাঁপুনির সম্মুখীন হবেন?

উত্তরটি হল হ্যাঁ। প্রতিবারই সন্তান জন্মের সময় আপনি শেষ পর্যায়ে হরমোনের ছোটাছুটি এবং কাঁপুনি অনুভব করবেন।

এছাড়াও, উপরে উল্লিখিত অভিজ্ঞতার কোনও একটাও যদি আপনার হয়ে থাকে তাহলে আপনি প্রসবকালীন কাঁপুনি আবার বোধ করতে পারেন।

আগে যেমন উল্লেখ করা হয়েছে, পূর্ববর্তী প্রসবের সংখ্যা এবং আপনার জন্ম পরিকল্পনা নির্বিশেষে প্রসবকালীন কাঁপুনি অনাহুতভাবে আসে। কিন্তু, মাকে স্বাভাবিক বোধ করার ও মানসিক শক্তির জন্য অনেকগুলি প্রাকৃতিক উপায় আছে।

 

নতুন মাকে আরাম দেবার এবং শান্ত রাখার সেরা উপায় কী?

যেহেতু নতুন মায়ের শিশুজন্মের সময় কম্পন হয়েছে, তাঁর শরীর এখনও নাজুক এবং ঠান্ডা হয়ে আছে। এই মুহুর্তে, তাঁর সবরকম সাহায্য প্রয়োজন -- তাঁকে মানসিক এবং শারীরিক, সবরকম সহায়তাই দিতে হবে।

এখানে তিনি যাতে শান্ত থাকেন এবং আরামপ্রদ বোধ করেন তার ঞ্জন্য কয়েকটি উপায় দেওয়া হল।

 

১। তাঁকে উষ্ণতা দিন

শিশু জন্মের পর যে মায়ের তীব্র কাঁপুনি হচ্ছে, ডাক্তার এবং নার্সদের প্রায় সঙ্গে সঙ্গে সেই মাকে কম্বল দিয়ে ঢেকে দেওয়া উচিত। এতে তাঁর শরীর গরম হবে এবং আরাম বোধ করবেন।

ডাক্তারেরা সাধারণত প্রসবের টেবিলে তাঁর শরীরের ঊর্ধ্বাংশ আগে থেকেই ঢেকে রাখেন কারণ, তাঁরা জানেন যে কি হতে চলেছে। প্রসব হয়ে যাবার সঙ্গে সঙ্গেই মাকে পরিষ্কার করেই পুরোপুরি কম্বল দিয়ে ঢেকে তাঁকে বিশ্রাম করতে দেওয়া হয়।

 

২। শিশুর সাথে ত্বকে ত্বকে সংস্পর্শ

উষ্ণতা এবং নিরাপত্তার অনুভূতি কেবল শিশুই অনুভব করে না, নবজাত শিশুটিকে কোলের মধ্যে রেখে মা সেই একই অনুভূতি লাভ করেন।

ডাক্তাররা সাধারণত নতুন মায়েদের অবিলম্বে শিশুটিকে কোলে রাখতে বলেন। যদি সম্ভব হয়, উষ্ণতা অনুভব করার জন্য তাদের বলা হয় ত্বকের সঙ্গে ত্বকের সংস্পর্শে থাকতে।

shaking during childbirth

কিছু মায়েরা এরকম করতে বা চাইতে নাও পারে। কিন্তু আসলে শিশুটির সাথে ত্বকে ত্বকে সংস্পর্শ তাঁর তাপমাত্রা কমাতে সাহায্য করতে পারে।

 

৩। ওষুধ

 

কিছু বিরল ক্ষেত্রে কম্পনের সঙ্গে জ্বর অনুষঙ্গী হয়। এটি মা ও নবজাতকের জন্য বিপজ্জনক হতে পারে।জন্মের এক ঘণ্টার মধ্যেই মায়ের শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানো উচিত। যদি মায়ের জ্বর থাকে, তাহলে শিশুটি মায়ের প্রথম দুধ এবং কোলোস্ট্রাম পাবে না।

এইসব ক্ষেত্রে, জ্বর এবং কাঁপুনি কমিয়ে ফেলার জন্য মাকে ওষুধ দেওয়া হতে পারে। তাঁকে উষ্ণ কম্বলে ঢেকে প্রসবজনিত অসুস্থতা থেকে সেরে ওঠার জন্য আরও সময় দেওয়া হতে পারে।

এখানে শুধু মনে রাখা দরকার যে সন্তানের জন্মের সময় কম্পন সম্পূর্ণ স্বাভাবিক। আসলে, এটি আপনার শরীরের পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়ারই একটা অংশ। এর একমাত্র মানে এটাই যে আপনার মানসিক, শারীরিক ও আবেগজনিত সমর্থন প্রয়োজন।

তাই যদি আপনি শিশু প্রসবকালীন কম্পনের ব্যাপারে আগে পড়েননি, প্রসব টেবিলে সেই অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য প্রস্তুত হোন।