প্রমাণিত! এই কারণেই কার্টুনগুলি আপনার সন্তানের আচরণকে প্রভাবিত করছে

শিশুদের মনের উপর কার্টুনের প্রভাব সম্পর্কে একটি নতুন গবেষণা এবং মা-বাবার সন্তান প্রতিপালন করার শৈলী, কতগুলি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে নিয়ে এসেছে।

আজকের সমযে যেখানে সবকিছু প্রযুক্তি নির্ভর, সেখানে আপনার সন্তানের ছোট পর্দার প্রতি আকর্ষণ সীমিত করা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। আধুনিক মা-বাবার সন্তান প্রতিপালন করার ঝক্কি প্রায়ই কিছু না কিছু আদায় করে নিচ্ছে এবং মা-বাবারা সচেতনভাবেই সন্তানদের কার্টুন দেখতে দেন কারণ তাঁদের পেশাগত কর্তব্য পালন করতে হয়।

কাজেই, যখন শিশুদের অনলাইনে কার্টুন দেখা একেবারে নিষেধ করাটা চরম পদক্ষেপ বলে মনে হতে পারে, সেখানে অন্ততপক্ষে আপনার শিশু কি দেখছে না দেখছে সেটা নিয়ন্ত্রণ করা একান্ত অপরিহার্য।

শিশু মনোবৈজ্ঞানিকদের মতে, শিশুরা তাদের অনুভূতিপ্রবণ বয়সে বাস্তব এবং কল্পনা আলাদা করে বাছতে পারে না এবং প্রায়ই তাদের চারপাশের জীবনের একটি বিভ্রান্তিমূলক ধারণা পায়, কেননা তারা কার্টুনগুলি দেখে অনেকটাই প্রভাবিত হয়।

একটি সাম্প্রতিক গবেষণায় এই সমস্যাটি তুলে ধরা হয়েছে এবং মা-বাবাকে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে যে তাঁরা যেন বিনা প্রাপ্তবয়স্কদের তত্ত্বাবধানে তাঁদের বাচ্চাদের কার্টুন দেখতে না দেন।

প্রাপ্তবয়স্কদের অংশগ্রহণের উপযোগিতা

শিশু মনে কার্টুনের প্রভাব এবং মা-বাবার সন্তান প্রতিপালন করার শৈলী সম্পর্কে ভদোদরার এম এস বিশ্ববিদ্যালয়ের এক স্নাতকোত্তর ছাত্রের সাম্প্রতিক গবেষণা কতগুলি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে নিয়ে এসেছে।

গবেষণাটি এই বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের ছাত্রী রুচিকা জৈন দ্বারা ১৪০ জন তত্বাবধায়কের ওপর করা হয়েছিল, যাদের মধ্যে অধিকাংশই ছিল মায়েদের সঙ্গে ৬ থেকে ১১ বছর বয়সী শিশুরা। গবেষণায় দেখা গেল যে কার্টুনগুলি দেখার জন্য বাচ্চারা গড়ে প্রতিদিন দুই থেকে পাঁচ ঘণ্টা ব্যস্ত থাকে।

বাচ্চারা অনলাইনে এইসব দেখে কি আহরণ করতে পারে সে সম্পর্কে মা-বাবার ভূমিকাই ছিল গবেষণার মূল বিবেচ্য বিষয়।

এই গবেষণার পরিচালক, মনোবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক কিরণ সিং রাজপুতকে উদ্ধৃত করে টাইমস অফ ইন্ডিয়ায় বর্ণনা করা হয়েছে যে এইসব কার্টুনগুলি থেকে শিশুরা কিরকম ইতিবাচক ও নেতিবাচক প্রভাবে অনুপ্রাণিত হতে পারে।

তিনি বলেন, "কার্টুন শিশুকে নেতিবাচক ও ইতিবাচক উভয় আচরণই শেখায়। যদি মা-বাবা অবহেলা করেন এবং কোন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন না, তাহলে সন্তানরা কার্টুন থেকে নেতিবাচক আচরণ শিখবে।"

আপনার সন্তান প্রতিপালনের শৈলী কি?

গবেষণা আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকও তুলে ধরেছে - সেটি হল সন্তান প্রতিপালনের শৈলী। গবেষণাটি তিন ধরনের শৈলী চিহ্নিত করেছে :

  • অবহেলা : যেখানে মা-বাবা তাঁদের সন্তানের তত্ত্বাবধান করেন না।
  • কর্তৃত্ববাদী : যেখানে বাবা-মা তাদের ছেলেমেয়েদের কোনও কার্টুনই  দেখতে দেয় না।
  • প্রতিক্রিয়াশীল : যেখানে বাবা-মা নিয়ন্ত্রণ করেন এবং সন্তানেরা কী দেখছে সে সম্বন্ধে সজাগ থাকেন।

এই গবেষণাটির দৃঢ় অভিমত, প্রতিক্রিয়াশীল অভিভাবকত্বই হচ্ছে সর্বোত্তম উপায়, যাতে আপনি আপনার সন্তানদের বোঝাতে পারবেন যে কার্টুনে যেসব জিনিস দেখা যায় সেগুলি কোনমতেই অনুকরণ করার চেষ্টা করা উচিত নয় এবং এর ফলে শিশুদের সামনেও দরজাটা খুলে যায় আর তাদের মনে কোনও সন্দেহ হলে অনায়াসে মা-বাবার সাথে কথা বলে সে সন্দেহ নিরসন করে নিতে পারে।

কিভাবে প্রতিক্রিয়াশীল মা-বাবা হবেন

এখন যেহেতু গবেষণাটি প্রতিষ্ঠিত করেছে যে আপনার সন্তানের চাহিদার প্রতি সজাগ থাকাই তাদের ইতিবাচক মূল্যবোধ শেখানোর সর্বোত্তম উপায়, সেইহেতু কিভাবে প্রতিক্রিয়াশীল মা-বাবা হওয়া যায় সে সম্বন্ধে এখানে কয়েকটি বিশেষজ্ঞ-অনুমোদিত উপায় জানানো হচ্ছে।

  1. আপনার সন্তানদের সাথে কথা বলুন : সর্বাগ্রে এ কথাটা বুঝতে হবে যে প্রতিক্রিয়াশীল হওয়া হচ্ছে একটি সামগ্রিক পথ। এটি শুধু আপনার সন্তানের কার্যকলাপের ওপর নজর রাখা নয় বরং এটা গুরুত্বপূর্ণ যে আপনি আপনার সন্তানকে তাদের ভাবনাচিন্তা, তাদের সন্দেহগুলি আপনার সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করতে উৎসাহ দেবেন। যেমন, স্কুলে তাদের দিনটা কেমন কাটল সে সম্পর্কে তাদের সাথে কথা বলে শুরু করুন এবং তাদের জীবন আপনার সঙ্গে ভাগ করে নেবার জন্য উৎসাহিত করুন।
  2. তাদের পাশে থাকুন : প্রতিক্রিয়াশীল মা-বাবা হওয়া মানে, আপনার সন্তানকে আশ্বস্ত করা যে যখনই তাদের প্রয়োজন হবে তখনই আপনি তাদের পাশে থাকবেন। যদি সন্তানের মধ্যে কোনও অবাঞ্ছিত আচরণ দেখতে পান, তাহলে বকাঝকা না করে তার সাথে কথা বলে বোঝার চেষ্টা করুন যে কেন সে এরকম করল। সর্বদা সমস্যার মূল কারণের গভীরে পৌঁছানোর চেষ্টা করুন।
  3. সতর্ক থাকুন : জবরদস্তি না করে অতন্দ্র মনোনিবেশ করুন। আপনাকে সন্তানের প্রতি মৃদু নজরদারি এমনভাবে করতে হবে যেন তারা দমবন্ধ অবস্থা না অনুভব করে। সন্তানেরা যেমন যেমন বড় হয়, তাদের একটা নিজস্ব জায়গার দরকার হয় সুতরাং, সবসময় তাদের জীবনে খুব বেশী জড়িয়ে থাকলে আপনি তাদের অযথা ভীত-সন্ত্রস্ত করে তুলবেন। অতএব এমন একটা নিরাপদ পরিমন্ডল গড়ে তুলুন যাকে তারা বিশ্বাস করবে।