প্রকৃত মায়ের মুখে শুনুন - “আমার জল ভেঙ্গে গেল কিন্তু বুঝিনি যে আমার প্রসব হবে”

প্রকৃত মায়ের মুখে শুনুন - “আমার জল ভেঙ্গে গেল কিন্তু বুঝিনি যে আমার প্রসব হবে”

দি ইন্ডাস প্যারেন্ট ব্যাবহারকারী এশা ভাটিয়া তাঁর চমকপ্রদ শিশু প্রসবের কাহিনি আমাদের শোনালেন! তাঁর জন্মদানের অভিজ্ঞতা আরও জানতে হলে পড়তে থাকুন ...

একটি প্রাণহীন সাদা টুকরোর উপর দু'টি লাল লাইন কিভাবে একটি মহিলার জীবন বদলে দেয়, সেটা অকল্পনীয়। গত বছরের জুলাই মাসে ১০ দিন ধরে আমার মাথায় সন্দেহটা ঘুরছিল, কিন্তু তবুও অন্তস্বত্তা কিনা সেটা পরীক্ষা করাবার সাহস আমার হয়নি কেননা এই বিরাট দায়িত্ব নিতে আমি ভয় পাচ্ছিলাম।

কোনোমতে সাহস সঞ্চয় করলাম এবং যখন দেখলাম যে ফলটি সত্যিই হাঁ-বাচক, আমার দুচোখ দিয়ে জলের ধারা নেমে এল আর খবরটা আমার বরকে জানানোর জন্য তর সইছিল না। তবুও আমি সন্ধ্যে পর্যন্ত অপেক্ষা করলাম।

যাই হোক আমার গাইনকলজিস্ট ডাঃ সোনি তৃতীয় মাস থেকেই আমাকে বিছনায় সম্পূর্ণ বিশ্রামে থাকতে বললেন কারণ আমার “স্পটিং” (প্রসব অবস্থায় রক্তক্ষরণ) হচ্ছিল। ভয়ঙ্কর আর বিরক্তিকর এক অনুভুতি হল এবং ঘরের বাইরে যাবার জন্য আমি ছটফট করছিলাম।

গর্ভাবস্থার উপযোগী যোগব্যায়াম আমার জন্য আশীর্বাদ ছিল

esha2

ঘটনাক্রম শীঘ্রই থিতিয়ে এল এবং ডাঃ সোনি আমার বাড়ির কাছাকাছি জনপ্রিয় যোগ ক্লাস 'রলি'র যোগা' তে যোগদান করতে উদ্বুদ্ধ করলেন। আমার কিছু ঘনিষ্ঠ বন্ধুরাও তাকেই সুপারিশ করেছিলেন এবং তাই আমি একটি ট্রায়াল নিয়ে দেখলাম যে তাঁর ক্লাস ইতিবাচক শক্তিে পরিপূর্ণ। অতএব, আমিও আমার গর্ভকালীন ক্লাস শুরু করলাম।
esha-1

বলা বাহুল্য, তাঁর ক্লাস আমার জন্য খুবই উপযোগী হয়েছিল এবং আমিও কোনও দিন কামাই না করে এ ক্লাসে উপস্থিত হবার জন্য উদগ্রীব হয়ে থাকতাম। আমার হর্মোনের গণ্ডগোল সারাতেও তারা সাহায্য করেছে।

দুর্ভাগ্যবশতঃ, আমি আমার গর্ভাবস্থার সপ্তম মাসে গর্ভকালীন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হই। এই সময় ডাঃ সোনি আমার ব্যাপারটা গ্রহণ করার জন্য রলি কে কঠোর নির্দেশ দেন, যারা সঙ্গে সঙ্গে আমাকে এক অবশ্য পালনীয় খাদ্য তালিকা এবং ফিটনেস রুটিন মেনে চলতে বলে।

তৃতীয় ত্রৈমাসিকের সময় কাজ করা ...

কিন্তু, আমার পরিবার একটি গর্ভবতী মহিলার ওপর খাদ্যের বিধিনিষেধ এবং তার তৃতীয় ত্রৈমাসিকের সময় যোগ-ব্যায়াম করতে বলা হচ্ছে, এগুলো মেনে নিতে পারছিল না। তাদের কোনও ধারণা ছিল না যে, এই রুটিন আমাকে শেষ মুহূর্তের প্রসব বেদনার সাথে মোকাবিলা করতে সাহায্য করবে।

তাঁর গর্ভাবস্থায় এষা'র ব্যায়াম ও রুটিন সম্পর্কে জানার জন্য পরবর্তী পৃষ্ঠায় পড়া চালিয়ে যান!

আমার কাজকর্মের রুটিন হল ৫০ বার উবু হয়ে বসা এবং হাঁটা, যেটাকে গর্ভবতী অবস্থায় যথেষ্ট কঠিন বলেই মনে করা হয়। কিন্তু আমি আমার প্রশিক্ষকের কাছ থেকে যে সহযোগিতা পেয়েছিলাম তা ছিল অবিশ্বাস্য। এমনকি তিনি হবু পিতাদের নিয়ে একটি ক্লাস করিয়েছেন এবং তাঁদের জন্য একটি সম্পূর্ণ দৃশ্যকল্প তৈরি করেছেন যাতে শেষ মিনিটের জরুরী পরিস্থিতি মোকাবেলা করার মতো করে তাদের প্রশিক্ষিত করতে পারেন।

অত বড় একটা বাচ্চাকে জন্ম দিতে হবে, এই ব্যাপারটাই আমাকে সারাদিন ধরে তাড়া করে ফিরছিল। আমার প্রসবের প্রত্যাশিত তারিখ ছিল ২১ মার্চ এবং আমি ২২ শে ফেব্রুয়ারি থেকে আমি দিন গুনতে শুরু করেছিলাম।

আমার স্বামী ইতিমধ্যে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে নির্ধারিত তারিখের অনেক আগেই ৬ই মার্চ পর্যন্ত আমাদের বাচ্চা হবে। ৫ই মার্চ আমার স্বামীর পুনে যাবার জন্য রওনা হবার ছিল এবং তিনি আমাকে বার বার জিজ্ঞাসা করতে লাগেলেন যে ওনার যাওয়া উচিত কিনা সে ব্যাপারে আমি নিশ্চিত তো - কারণ বাচ্চা ৬ তারিখেই হবে।

আমি এতে হেসে বলেছিলাম যে আমাদের কোনও মেষ রাশির বাচ্চা হবার সম্ভাবনা নেই! আসলে, আমরা দু'জনে আমাদের শিশুর রাশি কি হবে সেটা নিয়ে লড়াই করতাম। আমার রাশি মেষ আর কুনালের (আমার স্বামী) মীন, কিন্তু শিশুটির জন্মের প্রত্যাশিত তারিখ ছিল ২১ মার্চ!

আমার জল ভেঙ্গেছে কিন্তু আমি নিশ্চিত নই ...

esha3

৫ মার্চ রাতটা বেশ অস্বস্তিকর ছিল এবং আমি ঘুমাতে পারিনি। সকাল ৬ টা'র সময় কয়েক ফোঁটা জল বেরোনো শুরু হয়, তবে আমার জল ভেঙ্গেছে নাকি প্রস্রাব বেরিয়ে আসছে সে ব্যাপারে আমি নিঃসন্দেহ ছিলাম না। যেহেতু ঘটনাটি সকালের প্রথম দিকে ছিল তাই আমি শান্ত থাকলাম এবং পরের দিন সকাল ৯ টায় কি ঘটছে তা জানার জন্য আমি আমার যোগ প্রশিক্ষককে ফোন করলাম।

"ভগবান কো মাথা টেকো আর রওনা হও ... হাসপাতালে যাও, তুমি প্রস্তুত", তিনি বলেন।

আমি ত্রস্ত হলাম কারণ আমার স্বামী ধারে কাছে ছিল না, কিন্তু আমার শ্বশুরবাড়ির লোকেরা আমাকে হাসপাতালে নিয়ে গেল। হাসপাতালে ডাক্তার বললেন যে আমার জল ভেঙ্গে গেছে এবং আমি যে কোন সময় প্রসব করতে পারি।

তারা আমাকে মুখে ভরসা দিচ্ছিল, কিন্তু কিছুই হল না। দ্বিতীয় বার বোঝানোর পর প্রসব বেদনা ধীরে ধীরে ধীরে শুরু হল আর আমি বললাম "ইয়ে কাহাঁ পেন হো রহা হ্যায় (কই ব্যাথা করছে) .. এতো খুবই সহজ ব্যাপার!"

ডাঃ সোনি বললেন অপেক্ষা করে দেখ এরপর কি হচ্ছে!

৩ টের পরে ব্যথার তীব্রতা বাড়া শুরু হয়, কিন্তু সৌভাগ্যক্রমে আমার স্বামী আমার পাশে ছিল। আমার দুই মা পাশে থেকে যেভাবে যোগ এর ক্লাসে বোঝান হয়েছিল, সেইভাবে আমার পিঠে মালিশ করছিল যাতে সংকোচনের ব্যথায় আরাম হয়।

ব্যাথা কিন্তু বাড়তে, আরও বাড়তে লাগল কিন্তু আমি হাসপাতালে উবু হওয়ার মতো করেই যাচ্ছিলাম তাই মা বলল যে এই সময় এ কাজ আমি পাগলের মতো করছি। তিনি আমাকে ঠাণ্ডা হয়ে আরাম করতে বললেন, কিন্তু আমি রুমের মধ্যে হাঁটা ছাড়লাম না। আমার স্বামী নিজেকে শান্ত রেখেছিল এবং প্রতি মুহূর্তে আমাকে হাসিয়ে দিয়ে আমার মন কে অন্য দিকে সরানোর জন্য চেষ্টা করে গিয়েছে।

শেষ ধাপ …

7.45 নাগাদ অবস্থা অসহ্য হয়ে উঠল, এমনকি গরম স্নানের টবও কাজ করছিল না। আমি বিধ্বস্ত হয়ে পড়েছিলাম এবং লাগাতার একটি এপিডুরেল ভিক্ষা করছিলাম, কিন্তু ডাক্তার বললেন যে আমার শুধুমাত্র ১ সেন্টিমিটার বিস্তৃত হয়েছে। আমার বুক ভেঙ্গে গেল, কিন্তু শুধু শান্ত থাকা ছাড়া কিছুই করার নেই। ব্যথা অসহনীয় ছিল! আমি কাঁদছি এবং এপিডুরেলের জন্য কাকুতিমিনতি করছি আর তারা শিশুর হৃদস্পন্দন চেক করার সিদ্ধান্ত নিল।

প্রত্যেক সংকোচনের সাথে হৃৎস্পন্দন হ্রাস পেতে থাকল এবং সেই সময় সহকারী ডাক্তার ডাঃ সোনিকে খবর দিলেন। তিনি ও টি প্রস্তুত রাখতে আদেশ দিলেন এবং আমাকে একটি সি-সেকশন ডেলিভারি জন্য প্রস্তুত হতে বললেন। কিন্তু আমি এর জন্য প্রস্তুত ছিলাম না। আমি এত কষ্ট করে ব্যায়াম করেছি এবং উবু হয়ে হাঁটা শিখেছি যাতে আমার স্বাভাবিক প্রসব হয়। সংকোচনগুলি উচ্চ থেকে এবং উচ্চতর হতে লাগল এবং আরও ছোট ছোট বিরতিতে। আমি প্রার্থনা করলাম এবং অসহায়ভাবে একটি দীর্ঘশ্বাস ফেললাম!

সেই সময় ডাক্তার এসে পরীক্ষা করে বললেন ৯ সেমি প্রসারিত এবং চিৎকার করে বললেন "পোজিশন"।

কি ঘটছে সে সম্বন্ধে আমার স্বামী এবং আমি নিশ্চিত ছিলাম না। আমাকে একভাবে স্থাপন করা হয়েছিল এবং পরের তিন মিনিটের মধ্যে শিশুটি বেরিয়ে এসে কেঁদে ওঠে ... .... ডাঃ - হো গয়া !!!

"হ্যাঁ", তিনি বললেন, "ছেলে হয়েছে।"

সেই মুহূর্তটি আমার জীবনের সেরা মুহূর্ত ছিল এবং এই প্রসবটি আমার জন্য আসলে খুবই সহজ মনে হয়েছিল জার জন্য আমার যোগ প্রশিক্ষক, রলি মাদাম কে ধন্যবাদ।

আমার বাচ্চা ক্রিশে'র বয়স আজ ৬ মাস এবং পুরোপুরি মাতৃদুগ্ধ খেয়ে রয়েছে। আপনার নিজের সন্তানকে খাওয়ানো হল সর্বোত্তম উপহার যা একজন মা পেতে এবং দিতে পারেন। এই বুকের দুধ খাওয়ানোর দিনগুলি আর কখনোই ফিরে আসবে না এবং আমার ছোট্টটিকে খাওয়ানোর প্রতিটি মুহূর্ত আমি আনন্দে কাটিয়েছি ...

Source: theindusparent

Any views or opinions expressed in this article are personal and belong solely to the author; and do not represent those of theAsianparent or its clients.