কর্মরত মায়েরা কেন নিজেকে অপরাধী মনে করবে?

lead image

আমি এই ব্যাপারে আন্দিত যে আমি এক কর্মরত মা এবং আমি মাথা উঁচু করে বলি যে অফিসে আমি আমার মেয়ের কথা ভাবিনা

কিছুদিন আগে আমার এক বন্ধু আমাকে ফোন করে বলল যে সে একটি দারুন চাকরির অফার পেয়েছে। ৬ সংখ্যার মাইনে, ভারতের সবচেয়ে নামকরা টেক কম্পানিতে চাকরি এবং আরও অনেক ভাতা যা যে কোনও লোককে ঈর্ষা কাতর করবে।

আমি তার কথা শুনে খুবই খুশি হলাম, কিন্তু আমি জলদিই বুঝতে পারলাম যে সে আমাকে তার চাকরির উন্নতির কথা জানাতে ফোন করেনি, সে কোন ব্যাপারে বিচলিত ছিল। আমি অত্যন্ত আশ্চর্য হলাম এটা শুনে যে সে বিন্দুমাত্র খুশি নয় এই চাকরির ব্যাপারে, বরং একটু দুঃখিত যে তাকে এই চাকরি তাকে নিতে হবে প্রয়োজন মেটাতে।

“তুমি এত ভাল একটা অফার পেয়েছ তোমার তো দু হাত তুলে নাচা উচিত, আর তুমি এত বিমর্ষ?” আমি বললাম। “তুমি ঠিকই বলছ। কিন্তু বড় কাজ মানেই বেশি চাপ, বেশি দায়িত্ব, এবং বেশিক্ষণ অফিসে থাকা,” সে জবাব দিল।

আমি বুঝলাম। মাতৃত্বের অপরাধ বোধ তাকে হানা দিচ্ছিল। সে এই ব্যাপারে চিন্তায় ছিল যে সে বাড়ি ও কাজ কীভাবে সামলাবে এবং তার বাচ্চা কে একা রেখে কীভাবে থাকবে।
working mothers

আমি মন দিয়ে তার কথা শুনলাম তারপর বললাম, “তোমার স্বামীর কি মত এ ব্যাপারে? সেও কি এরকমই কষ্টে, চাপে কাজ করতে যায়? সে কি তোমাকে ফোন করে রোজ জিজ্ঞাসা করে যে মেয়ে খেয়েছে কিনা? সে কি প্রত্যেকটা মিটিং এ স্কুল যায়? সেকি নিজেকে দোষ দেয় অফিস থেকে দেরিতে ফিরলে?”

“নিশ্চয় না,” সে বলল। “তা হলে মায়েরা সবসময় নিজেকে এরকম অপরাধী মনে করে কেন?” আমি জিজ্ঞাসা করলাম।

অনেকেই আমার এই বক্তব্যকে কটু ও স্বার্থপর মনে করবে, অথচ আমার একথা বলতে মোটেই লজ্জা লাগেনা। কর্মরত মহিলারা কেন সবসময় অপরাধী মনে করবে নিজেকে? প্রতিবার কাজে দেরি হলে, বা বাচ্চাকে অন্য কারুর সাথে রেখে কাজে যেতে তারাই কেন কষ্ট পাবে?

পরের পৃষ্ঠায় পড়ুন কর্মরত মায়েদের কেন নিজেকে অপরাধী মনে করা উচিত নয়

আমি এই ব্যাপারে আন্দিত যে আমি এক কর্মরত মা এবং আমি মাথা উঁচু করে বলি যে অফিসে আমি আমার মেয়ের কথা ভাবিনা। কিছু ব্যাতিক্রম নিশ্চয় থাকে, যেমন তার যদি অসুখ করে, কিন্তু তাছাড়া আমি আমার কর্মক্ষেত্রে আনন্দে থাকি। এই সব কারনে আমি আপরাধ বোধ করিনা -

১। আমার কাজ আমাকে আনন্দ দেয়

আমি আমার কাজে খুশি তাই আমি রোজ খুশি মনে কাজে যাই। এটা আমাকে সন্তুষ্ট ও সুখী করে। আমার কাজ আমাকে প্রতিদিন সকালে উঠতে, এবং আমি যা করতে ভালবাসি তা করতে প্রেরণা দেয়। অফিসে আমার অনেক বন্ধু আছে যারা প্রত্যেকেই আমাকে নানা ভাবে অনুপ্রেরিত করে। আমরা নিন্দা করি, দোষারোপ করি কিন্তু দিনের শেষে সব দুঃখ-কষ্ট হাসি ঠাঠায় উড়িয়ে দি।

২। আমি নানা কাজ করতে সক্ষম

আমার দিন শুরু হয় ভোর ৬ টায়, যেই মুহূর্তে আমি ঘুম থেকে উঠি, আমি এক মুহূর্তও নষ্ট করিনা বা গড়িমসি করিনা (অবশ্য অফিসে কি পড়ে যাব সেটা নিয়ে ভাবা ব্যাতিক্রম)। মাঝে মাঝে আমি আমার সকালের চা খাওয়া, মেয়ের চুল বাঁধা এবং তার লাঞ্চ বক্স প্যাক করা একসাথে করি। আমিও তার সাথেই তৈরি হয়ে তাকে স্কুলে নামিয়ে কাজে চলে যাই।
Working mothers

চাকরি আমার জীবনে এক শৃঙ্খলা এনে দিয়েছে, এটা আমাকে নানাকাজ করতে সক্ষম করেছে। বিশ্বাস করুন, আমি বাচ্চাকে দুধ খাওয়াতে খাওয়াতেও কল নিয়েছি।

৩। আমি সময়ের গুরুত্ব বুঝি

আমার মেয়ের সাথে ১৫ মিনিটও আমার জন্য দামি এবং আমারা দুজনেই এটা ভাল ভাবে কাটাই। তার মানে আমরা টিভি দেখে সময় নষ্ট করিনা (উইকেন্দ ছাড়া) এবং নিজেদের মনের কথা বলি।

আমারা একে অপরের সময়কে মুল্য দি এবং কখনই কথাও দেরি করিনা। সবচেয়ে ভাল ব্যাপার যে আমার মেয়ে সময় কে স্মমান করা ছোট থেকেই শিখে নিচ্ছে।

৪। আমি এক আনন্দিত মা

যখন আমি মা হই আমি কাজ থেকে লম্বা ছুটি নিয়েছিলাম যাতে আমি মাতৃত্বকে উপভোগ করতে পারি। কিন্তু মাঝেমাঝেই আমি ভীষণ বিমর্ষ হয়ে পড়তাম যে আমি সময় এভাবে নষ্ট করছি। অনেক সময় আমি ভীষণ বিরক্ত হতাম এটা ভেবে যে আমি সুধুই বাচ্চার সেবা করছি এবং বহুবার এইসব ভেবে কান্নাকাটি করেছি।

কাজে জয়েন করার পর থেকে আমি বেশি খুশি থাকি এবং শান্তও। তাছাড়া আমি নানারকম জটিল ব্যাপারও ভাল ভাবে পরিচালনা করি, এটা মাথায় রেখে যেন আমার মেয়ে এতে কষ্ট না পায়। কারন আমি আমার মেয়ে দুখি দেখে খুবই কষ্ট পাব। আমার ভীষণ কষ্ট হবে যদি আমি কাজে বেরনোর সময় দেখি যে আমার মেয়ের মুখ ভার।

আপনারা, যেই সব মহিলারা মাতৃত্বের অপরাধ বোধে ভুগছেন, আমি তাঁদের সুধু একটাই প্রশ্ন করতে চাই। সুধু কর্মরত মায়েরাই কেন অপরাধ বোধে ভুগবে, কর্মরত পিতারা তো নিজেকে অপরাধী মনে করে না?

Source: theindusparent