"আমি শ্বশুর-শ্বাশিড়ির সাথে একটি যৌথ পরিবারে থাকি ...। কিন্তু এবার আমি চলে যেতে চাই "

lead image

"যদি আমরা আমাদের দু-বছর বয়সী মেয়েটির জন্য কিছু কিনি, তবে তাঁর প্রথম মন্তব্য হয় যে বাড়িতে আরও বাচ্চা আছে!"

আমি ভারতের এমন একটি ব্যবসায়ী সমাজের মেয়ে যেখানে সবাই একটা বড়, যৌথ পরিবারে একসঙ্গে থাকে। আমি নিজেও জ্যাঠা, কাকা, জেঠিমা, কাকীমা এবং আমার আধ ডজন জেড়তুতো খুড়তুতো ভাই বোনদের সঙ্গে একটি যৌথ পরিবারে বড় হয়েছি।

তাই যখন একটি বড় ব্যবসায়ী পরিবার থেকে আমার বিয়ের প্রস্তাব এল, এটা কোনও উদ্বেগের বিষয় ছিল না।   বরং আমি আমাদের মতোই হইচই ও ভালবাসায় ভরা একটি অন্য পরিবারের একজন হওয়ার জন্য বেশ উত্তেজিতই ছিলাম বলা যায়।

এছাড়াও আমার জেড়তুতো খুড়তুতো ভাই বোনদের মধ্যে সবচেয়ে বড় হওয়ার কারণে, আমি পরিবারের সব বাচ্চাদের অনেকটা মায়ের মতো হয়ে গিয়েছিলাম এবং আশা করেছিলাম যে আমার দৃঢ় পারিবারিক মূল্যবোধ দ্বারা অনায়াসে নতুন পরিবারের হৃদয় জয় করে নেব।

যেহেতু আমাদের সম্বন্ধ করে বিয়ে হয়েছিল, বিয়ের আগে আমি বা আমার স্বামী কেউই সেরকম বন্ধুত্ব পাতাবার অবসর পাইনি।  উভয় পরিবারের ব্যাবস্থাপনায় কয়েকবার আমরা একান্তে মিলিত হয়েছি বটে কিন্তু  কখনই পরস্পরের কাছে সম্পূর্ণ উন্মুক্ত হইনি।  সেসময় বরং পরস্পরের সঙ্গে অভূতপূর্ব ভাল ব্যবহার করে গেছি এবং কখনই পরস্পরের পরিবারে খারাপ কিছু আছে কিনা, সে সম্বন্ধে আলোচনাই করিনি।

বিয়ের পর যখন আমার নোতুন বাড়িতে গেলাম, শুরুতে সব কিছুই মনোরম এবং কুসুমাস্তীর্ণ বলে মনে হল।  এটি ছিল এক আদর্শ পরিবার - আমার শ্বশুর-শ্বাশুড়ি, তাঁদের তিন ছেলে সহ তাদের স্ত্রীরা এবং তাদের বাচ্চারা আর অবিবাহিতা মেয়েরা - আমরা সবাই একসঙ্গে থাকতাম, একজসঙ্গে রান্না হত, আর সত্যি কথা বলতে কি সে বাড়িতে একটা মুহূর্তও নীরস ছিল না।

কাঠামোটি এত প্রেমময় ছিল না ...

ধীরে ধীরে, যেমন যেমন আমার বিয়ের নবীনতা ম্লান হতে শুরু হয়ে করল, তেমন তেমন আমি বুঝতে লাগলাম যে ওপর থেকে সবকিছু যত সরল ও শান্ত বলে মনে হচ্ছিল, মোটেই তা নয়।  আমার স্বামী যৌথ পারিবারিক  ব্যবসায় তার ভাই ও বাবার সাথে শহরে একটি গয়নার দোকান চালান।

প্রায় প্রতি মাসে ভাইয়ের মধ্যে বিশাল এক তর্ক শুরু হয় যে, কিভাব অন্যজন ব্যবসার লাভ বাড়াবার জন্য যথেষ্ট করছে না।  আমি লক্ষ করে দেখেছি যে এই কলহের প্রভাব পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের মধ্যেও সংক্রামিত হয় এবং বাড়ির মহিলারাও একে অপরের সাথে কিছুদিনের জন্য বাক্যালাপ বন্ধ করে দেয় বা একে অপরের ব্যক্তিগত বিষয়গুলি নিয়ে উপহাস করতে থাকে।

এটা আমার কাছে নেহাতই বালখিল্য আচরণ বলে মনে হত যখন ভায়েরা ঝগড়া শুরু করলেই আমার ননদেরা রান্নাঘরে এসে সেটি লাগাতো এবং এমনকি আমাদের যে শিশুরা একসঙ্গে বড় হচ্ছে, তাদেরও বাদ দিত না।

জঘণ্য থেকে জঘণ্যতম...

চার বছর ধরে আমি এই যৌথ পরিবারে বাস করছি এবং সবকিছু কেবল জঘণ্য থেকে জঘণ্যতম হয়ে যেতে দেখছি। যেহেতু আমি শিক্ষকের চাকরি করি এবং আমার দুই ননদ ঘরেই বসে থাকে, তারা প্রায়ই একযোগে সেয়ানা  মন্তব্য করে যে, তারা কীভাবে সারাদিন খেটে মরে যাতে আর একজন এসে আরাম করতে পারে।  আমি জানি যে এই চোরাগোপ্তা খোঁটাটা আমাকে উদ্দেশ্য করেই দেওয়া হচ্ছে।

src=https://www.theindusparent.com/wp content/uploads/2017/07/in laws.jpg "আমি শ্বশুর শ্বাশিড়ির সাথে একটি যৌথ পরিবারে থাকি ...।  কিন্তু এবার আমি চলে যেতে চাই "

আমার শাশুড়ীও আমাদের জন্য খুব সহজ পাত্রী নন।  যদি আমরা আমাদের দু-বছর বয়সী মেয়েটির জন্য কিছু কিনে আনি, তবে তাঁর প্রথম মন্তব্য হয়, বাড়িতে আরও বাচ্চা আছে।  যদিও আমি একমত যে সব শিশুর সঙ্গে সমান ব্যবহার করা উচিত, তবুও এটা আমার বাড়াবাড়ি বলে মনে হয় যে আমি যদি মেয়েটির জন্য একটা টুথব্রাশও কিনে আনি তাহলে সব বাচ্চাদের জন্য ওই একই জিনিস কিনে আনতে হবে, বিশেষতঃ যখন আমি জানি যে তাদের এ জিনিষটির প্রয়োজন নেই।

পাশাপাশি, আরও ব্যবহারিক সমস্যাও আছে।  আমার স্বামী পারিবারিক ব্যবসা থেকে একটি সমান অংশ পায়, কিন্তু আমরা কখনও সখনও একসাথে বাইরে খাওয়া বা একটি সিনেমা দেখার কথা স্বপ্নেও ভাবতে পারি না।  

যেহেতু বাড়ীতে অন্যান্যরাও আছেন তাঁরা অনিবার্যভাবে আশা করবেন যে আমরা প্রত্যেককেই সাথে নিয়ে যাী।   একটি বিরাট পরিবারকে সঙ্গে নিয়ে প্রতি সপ্তাহে বাইরে খাওয়াদাওয়া করা আর্থিকে দিক থেকে সবসময় সম্ভব নয়।

তুচ্ছ বিষয়ে প্রতিযোগিতা

বাড়ির মহিলামহলে, সবসময় তুচ্ছ বিষয়ে প্রতিযোগিতা চলতে থাকে। যদি আমি একটি নতুন পোষাক পরি, পরের দিন অন্য ননদ দুটিকেও কেনাকাটা করতে হবে। যদি আমার স্বামী আমাকে কোনও একটি বিশেষ উপলক্ষে একটি গয়না কিনে দেয়, তবে আমার শ্বশুর বলবেন যে আমরা এত বাড়তি খরচ করছি বলেই ব্যবসাটি বাড়ছে না।

শুধু তাই নয়, যদিও আমাদের জন্য একটি আলাদা কামরা বরাদ্দ আছে, স্বামীর ছোট বোন যখন ইচ্ছে মন্থর পায়ে ঢুকে পড়ে আর কামরাটিকে তার পড়ার ঘর বানিয়ে ফেলে।  কখনও কখনও সে গভীর রাত পর্যন্ত সেখানেই কাজ করতে থাকে, যার ফলে আমি এবং আমার স্বামীর বিন্দুমাত্র নিজস্বতা থাকে না।

আমি আমার স্বামীকে বলার চেষ্টা করেছি যে, একটি যৌথ পরিবার ব্যবস্থা কেবল তখনই সফল হয় যখন সবাই একে অপরের সুবিধা অসুবিধার ব্যাপারে সতর্ক থাকে কিন্তু পরিবারের জ্যেষ্ঠ পুত্র হওয়ার কারণে সে প্রত্যেকেকে খুশি করাটা তারই দায়িত্ব বলে মনে করে।

আমরা শুধু স্বামী-স্ত্রী মিলে একটা নৈশভোজে যেতে বা ছুটি কাটাতে কখনই যেতে পারি না কারণ, একসঙ্গে থকার জন্য যখনই আমাদের পরিকল্পনার কথা বলি, আমার শ্বশুর মশাই উপদেশ দেন যে কম সে কম বাচ্চাগুলোকে সঙ্গে নিয়ে যাও, তা নাহলে ওরা নিজেদের বঞ্চিত বলে মনে করবে।

ভন্ডামো

আমি ভাবি যে যদি আমরা একে অপরের জীবন এবং সাফল্য সম্পর্কে সুখী হতে না পারি, তাহলে একসঙ্গে থেকে আরো তিক্ততা সৃষ্টি করা কেন!  একই ছাদের নীচে একে অপরের ইচ্ছা ও আকাঙ্ক্ষাগুলিকে টুঁটি চেপে ধরার চাইতে আলাদা আলাদা থেকে মাঝে মাঝে মিলিত হওয়া তো অনেক ভাল।

আমি আমার স্বামীকে চলে যাওয়ার কথা বিবেচনা করতে বলেছি কিন্তু সে পারিবারিক নিরাপত্তা কে বিঘ্নিত করার ব্যাপারে কাঁচুমাচু।  যেহেতু সে আর্থিক ভাবে স্বাধীন নয়, সেইহেতু সবসময়ই কর্মচ্যুত হবার ভয়ে ভীত।

আমি নিজের যে পরিবারকে পিছনে ফেলে এসেছি, সেখানকার মতো এই নোতুন পরিবারে কখনোই আমি এমন একটা মুহূর্তও পাইনি যাতে মনে হয় যে আমরা সবাই সুখে দুঃখে একসঙ্গে আছি। মনে হয় আমরা সবসময় একে অপরকে দমন করার চেষ্টা করছি।

চাকরি করা মায়ের দুঃখ

একটি দুই-বছরের মেয়ের চাকরি করা মা হয়ে, আমার সন্তানের প্রতি অমনোযোগী হওয়ার জন্য আমি নিজেকে সর্বদা তিরস্কার করি। যদি আমি আমার মেয়েকে আমার স্বামীর সাথে একটু বাইরে নিয়ে যেতে চাই তাহলে আমাকে বুঝিয়ে দেওয়া হয় যে আমি বাচ্চাকে যথেষ্ট সময় দিতে না পারার অপরাধের এভাবে ক্ষতিপূরণ দিতে চাইছি।

src=https://www.theindusparent.com/wp content/uploads/2016/09/sad woman copy.jpg "আমি শ্বশুর শ্বাশিড়ির সাথে একটি যৌথ পরিবারে থাকি ...।  কিন্তু এবার আমি চলে যেতে চাই "

যদি কখনও আমি কিছু কিনি বা আমার স্বামী আমার জন্য কিছু কেনে, তবে আমাদের সে দামটা অন্যান্য সবার সাথে ভাগ করে নিতে বলা হয়।   আমরা কি খাচ্ছি, কি পরছি, এমনকি কতটা সময় পরস্পরের সঙ্গে কাটাচ্ছি, সব কিছুই পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত করা হয়।

সপ্তাহান্তের ছুটির দিনে যদি আমি ঘুম থেকে উঠতে একটু দেরী করি, তখন আমার শাশুড়ী দরজায় জোরে জোরে ধাক্কা দিয়ে জানায় যে কিভাবে অন্য বৌমারা রান্নাঘরে কাজ করছে।

সত্যি কথা বলতে কি, এখন আমি সবাইকে সন্তুষ্ট করতে করতে ক্লান্ত হয়ে গেছি এবং যখন আমি কাজ থেকে ফিরে আসি, এক মুহূর্তের জন্য মনে বাসনা জাগে যে, জুতো জোড়া ছুঁড়ে খুলে দিয়ে এক কাপ চা নিয়ে আরাম করে বসি।  কিন্তু হায়, পরিবর্তে আমার কাছে আশা করা হয় যে এক্ষুণি রান্নাঘরের দায়িত্ব বুঝে নিয়ে চাকুরীক্ষেত্রে যে সময় ব্যয় করেছি তার ক্ষতিপুরণ করি।

যদি একটি যৌথ পরিবারের মানে তোমার আবেগে ঘা দিয়ে আতঙ্কিত করা, তাহলে আমাদের এটাকে টেনে নিয়ে যাওয়ার কি মানে হয়?  কখনও কখনও প্রথাগুলি সত্যিকারের লাভজনক যত না তার চেয়ে বেশী ভন্ডামো। আমি আমার স্বামীকে বোঝানর চেষ্টা করে চলেছি কিন্তু ততদিন আ্মাকে এই বড় কিন্তু অশান্তিপূর্ণ পরিবারের সাথে শান্তি বজায় রেখে চলতে হবে।

(অস্বীকৃতি : পরিচয় সুরক্ষিত রাখার জন্য লেখকের নাম উহ্য রাখা হয়েছে।  এই গল্পটি জোফীন মাকসুদকে

বলা হয়েছিল)

Source: theindusparent