“আমার নর্ম্যাল ডেলিভারিতে কোনও কিছুই ‘নর্ম্যাল’ ছিল না”

মীনাক্ষী আয়ার তাঁর সন্তানের জন্মকাহিনি শেয়ার করেছেন এবং জানিয়েছেন যে কিভাবে তাঁর ক্ষেত্রে নর্ম্যাল ডেলিভারি এক বিভীষিকাময় ভ্রুণ পরবর্তী অভিজ্ঞতায় পর্যবসিত হয়েছিল।

আমার গর্ভাবস্থার ন’মাস ছিল এক মৃদুমন্দ বাতাসের মতো ছিল (অবশ্যই প্রথম ত্রৈমাসিক ছাড়া, যখন সবার শরীরে একটি ছোট্ট মানুষ ক্রমে বড় হওয়ার সঙ্গে মানিয়ে নেয়। মানে, সকাল বেলার অসুস্থতা, বুক ধড়ফড়, প্রবল উদ্বেগ, হরমোনের সঘণ পরিবর্তন)।

অন্তিম পর্যায় পর্যন্ত কাজ করতে পারায় আমি খুব খুশী ছিলাম, আমি শারীরিক ভাবে সক্ষম ছিলাম (যোগ ব্যায়ামের সুবাদে) এবং আমি স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পেরেছিলাম। সংক্ষেপে, শুধু পেট বড় আর শেষের দিকে খুব ক্লান্তিবোধ করা ছাড়া আমি খুব বেশী স্বাস্থ্য সমস্যায় পড়িনি।

আমার সুন্দর সন্তানটির জন্ম দেবার পর ৫ মাস পেরিয়ে গেছে কিন্তু এখনও তা থেকে সম্পূর্ণ সুস্থ হতে পারিনি যাকে বলা যায়, এক বিভীষিকাময় ভ্রুণ পরবর্তী অভিজ্ঞতা।

১০ দিনের মধ্যে আমার বাচ্চা জন্মাবার ছিল

বাচ্চার যেদিন জন্ম হয়েছিল তার আগের দিন – ১৬ই ডিসেম্বরের কথা আমার পরিষ্কার মনে আছে।্যাথ আমার স্বামী আর আমি রাতের খাবার খেয়ে পেরিয়ে যাওয়া দিনটার কথা বলাবলি করছিলাম। তীব্র ব্যাথা শুরু হল রাত সাড়ে এগারাটা নাগাদ। ব্যাথাটা এমনিই ভেবে আমি সেটা মন থেকে ঝেড়ে ফেলতে চাইলাম কারণ সেদিন সকালেই ডাক্তার নিশ্চিত করে বলেছিলেন যে বাচ্চাটির বেরিয়ে আসার জন্য এখনও কোনও ব্যস্ততা নে। আরও দিন দশেক পরে হবে।

রাত যত এগিয়ে গেল, ব্যাথা বাড়তে লাগল। ঘুমাতে পারছিলাম না বলে আমরা রাত দুটো পর্যন্ত গল্প করে গেলাম। রাত আড়াইটা নাগাদ আমাদের চোখ বন্ধ হতে লাগল আর আমরা একে অপরের কথা বুঝতে পারছিলাম না।

সেই রাত্রে আমি স্বপ্নে দেখলাম যে একটা লিফটে আমার জল ভেঙে গেছে। আমি ভয়ে জেগে উঠলাম আর বুঝতে পারলাম যে স্বপ্নে যা দেখেছি সেটা সত্যি সত্যিই হয়েছে। ৩টে ৪৫ মিনিটে স্পষ্টতই আমি আ্যাম্নিওটিক ফ্লুইডের ওপর ছিলাম আর আমার বিছানা ভিজে গিয়েছিল। ধীরে ধীরী উঠে পরীক্ষা করার জন্য আমি বাথরুমে গেলাম।

Artwork courtesy: Indu Harikumar for the India Birth Project

কোমোডের ওপর বসার সাথে সাথে দেখলাম যে আমার ভেতর থেকে রক্তের ছিটে সহ শ্লেষ্মার তীব্র প্রবাহ বেরিয়ে আসছে। আমি ভয় পেলাম না, আমি জানতাম যে এবার হাসপাতালে যেতে হবে। আমি জানতাম যে সে আসছে।

নিদারুণভাবে আমি স্বাভাবিক প্রসব চাইছিলাম

হাসপাতালে পৌঁছাবার পর যতক্ষণ প্রসবের প্রস্তুতি চলছিল আমি প্রসবপূর্ব যোগের ক্লাসে শেখা শ্বাস-প্রশ্বাসের কৌশলগুলি করে যেতে লাগলাম। সংকোচন যত তীব্র হতে লাগল, আমি আমার যোগের মাদুর বিছিয়ে বিড়াল-ঊট আসন করা শুরু করলাম। কারণ, নিদারুণভাবে আমি স্বাভাবিক প্রসব চাইছিলাম।

গর্ভাবস্থার পুরো সময়টায় আমি সি-সেকশনের পর সেরে উঠতে মহিলাদের কতো ঝামেলা হয়েছিল সেই সব আতঙ্কজনক কাহিনী পড়েছি। আমি আরও পড়েছি যে টাকার জন্য ভারতের নার্সিং হোম গুলি কিভাবে জোর করে মহিলাদের সি-সেকশন করে। আমি সেই সব মহিলাদের কথাও পড়েছি যাঁরা সি-সেকশনের পর হাজার চেষ্টাতেও গর্ভকালীন বেড়ে যাওয়া ওজন আর কমাতে পারেন নি।

আমি জানতাম যে আনন্দদায়ক প্রসব পরবর্তী অভিজ্ঞতার জন্য স্বাভাবিক প্রসব একমাত্র উপায়। শুধু জানতাম যে ভারতে যোনিপথে প্রসবের ব্যাপারে কোনোকিছুই ‘স্বাভাবিক’ নয়।

সকাল ৮ টা নাগাদ আমাকে লেবার রুমে নিয়ে যাওয়া হল। আমি ইতিমধ্যে ৩ সেন্টিমিটার প্রসারিত করে ফেলেছিলাম এবং প্রচণ্ড ব্যাথাতে ছিলাম। এর মধ্যে হাসপাতালে ৪ ঘন্টা কেটে গেছে, রক্তের নানা পরীক্ষার জন্য হাত ফোঁড়া হয়েছে এবং ডুস দেওয়া হয়েছে। মনে আছে, ব্যাথা আরও বাড়ার পর আমি লোহার খাটে হাত আছড়াতে লাগলাম। মনে আছে, এবার সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়া ব্যাথা কমবে এই আশায় আরও জোরে জোরে ঘুসি মেরেছি, কিন্তু লাভ কিছুই হয় নি।

ব্যাপারটা আরও সঙ্গীন করে তুলতে, তাড়াতাড়ি ডাক্তার পিটোসিন আইভি ড্রিপ দেওয়া শুরু করলেন কারণ আমার বাচ্চা নাকি জন্মনালীতে নেমে আসে নি। কয়েক মিনিটের মধ্যে সংকোচন অসহ্য হয়ে উঠল। এর মধ্যে আমি ব্যাথার দশম স্তরে পৌঁছে গেছি, চীৎকারের পর চীৎকার করে চলেছি কিন্তু উপস্থিত নার্সদের কাছ থেকে কোনও সহানুভূতি পেলাম না।

আমার স্বামীকে আমার সাথে থাকতে অনুমতি দেয় নি

আমার স্বামীকে আমার কাছাকাছি থাকার অনুমতি দেওয়া হয়নি। তিনি শুধু দূর থেকে “দৃশ্য” দেখতে পাচ্ছিলেন। তাঁর বারংবার অনুরোধ করা শুধু বধির কানে রয়ে গেল। তিনি শুধু আমার হাত ধরে বলতে চেয়েছিলেন যে আমি ঠিক হয়ে যাব। আসলে, তাঁকে বেশ কয়েকবার রুমটি ছাড়তে বলা হয়েছিল। এই সব ঘটেছে যখন আমি ব্যথায় এখানে কাতরাচ্ছি এবং অসহায় বোধ করছি।

সাড়ে নটায়, আমার শরীর হাল ছেড়ে দিতে শুরু করল। আমি আমার চোখের সামনে বিনা হস্তক্ষেপে  প্রসবের স্বপ্ন চূর্ণ হয়ে যেতে দেখলাম। পিটোসিনের শক্তিশালী ওষুধ আমার শরীরকে স্বাভাবিক প্রসবে বাধা দিয়েছিল। এই সব হস্তক্ষেপের ফলে সবকিছ জটিল হওয়া শুরু হয়েছিল। এখন ব্যথা আর সহ্য করতে পারছি না, আমি এপিডুর‍্যালের জন্য অনুরোধ করলাম।

কয়েক মিনিট অসাড় এবং বেদনাহীণ বোধ করার পর, আবার ব্যথা শুরু হল। এই সময় আমি ৮ সেমি প্রশস্ত করে ফেলেছিলাম কিন্তু বাচ্চা তখনও নেমে আসে নি। আমাকে আবার শক্তিশালী ডোজে পিটোসিন দেওয়া হল এবং পুনরায় এপিডুর‍্যালে নিতে হল।

অবশেষে বেলা সোয়া এগারোটার সময়, আমার ডাক্তার ঘোষণা করলেন যে এবার আমিে ধাক্কা দেওয়া শুরু করতে পারি। কিন্তু কীভাবে আমি ধাক্কা দেব বা কিসে ধাক্কা দেব? তখন আমি কোমরের নীচে কিছু আছে বলে বুঝতেই পারছি না। আমি গাঢ় অন্ধকারে তীর নিক্ষেপের মতো ধাক্কা দেওয়া শুরু করলাম। এক সময়, আমার অ্যানেসথেটিস্ট – যার ওজন কমপক্ষে ১০০ কেজি তো হবেই – আমার পেটের উপর বসে পড়ল। আমি কোনও স্পষ্ট নির্দেশ ছাড়াই চাপ দিয়ে যাচ্ছিলাম।

অবশেষে, বেলা ১১ টা ৩৯ মিনিটে আমি একটি ক্ষীণ কান্নার শব্দ শুনতে পেলাম। আমি এক মিনিটের জন্য চোখ বন্ধ করলাম এবং আমার ডাক্তার ঘোষণা করলেন যে এবার তিনি সেলাই করবেন। আমার মেয়েকে বের করার জন্য তাকে এপিসিওটোমি (যোনির মুখ খোলার জন্য কাটা) করতে হয়েছিল। অথচ একবার ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলার সময় আমি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছিলাম যে আমি এপিসিওটোমি চাই না। কিন্তু আমাকে বলা হলও যে এটা ভারতে সাভাবিক পদ্ধতি। আমার মনে হয় যে আমাকে আরও শক্তভাবে প্রতিবাদ করা উচিত ছিল।

যেহেতু আমি আমাকে আমার সন্তানের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে সংযুক্ত রাখার অনুরোধও জানিয়েছিলাম, তাকে পরিষ্কার করতে নিয়ে যাবার আগে আমার বুকের ওপর ঠিক ৩০ সেকেন্ড রাখা হয়েছিল। সেই হতবুদ্ধি অবস্থার মধ্যেও আমার মনে আছে যে সেই অ্যানেসথেটিস্ট কিভাবে ভাবতে পেরেছিল যে আমার ইচ্ছা নিয়ে রঙ্গ করার সেটাই উপযুক্ত সময়।

প্রায় ১০ সেন্টিমিটারের মতো কাটা সেই গভীর ক্ষত থেকে প্রচুর রক্তপাত হয়েছিল, যার ফলে আমার হিমোগ্লোবিন ১২ থেকে ৬ এ নেমে গেল। আমাকে দু বোতল হিমোগ্লোবিন দেওয়া হল, তাতেও কাজ না হওয়াতে আমাকে এক বোতল বিশুদ্ধ লোহিত রক্ত কোষের রক্ত দেওয়া হল। আমি হুকে আইভি টাঙ্গানো অবস্থায় বাড়তি ৪ দিন হাসপাতালে কাটালাম, বিনা ব্যাথায় আমার নবজাত শিশুটিকে একবারও দুধ খাওয়াতে বা কোলে নিতে পারছিলাম না।

এত ফুটো করার ফলে আমার দুই হাতেরই স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হল, ব্যাথার জন্য আমি দু সপ্তাহ পর্যন্ত হাত তুলতে পারিনি। তার পর থেকে নানা জটিলতা দেখা দিতে লাগল : থ্রম্বোফ্লেবাইটিস, ফিসার, মেরুদন্ডের নীচে এবং শ্রোণিদেশে প্রচণ্ড ব্যাথা। তবু আমার মেয়ের হাসি মুখ আমাকে প্রকৃতিস্থ রেখেছিল এবং অবশ্যই পরিবার ও বন্ধুদের ভালবাসা।

এখন আমার মেয়ের বয়স পাঁচ মাস। জন্মের পর থেকে প্রতিদিন আমি তাকে আমার বুকের দুধ খাইয়েছি, এমনকি যখন দুটি আইভি ছুঁচ বেঁধানো ছিল, তখনও। প্রায় দু’মাস আমি পাঁচ মিনিটের জন্যও সোজা হয়ে বসতে পারি নি। কিন্তু আমি বুকের দুধ খাইয়ে গেছি কারণ আর কিছু আমি পারতাম না। এখনও আমাকে অনেক ব্যাথা সহ্য করতে হয়। কিন্তু একজন মা হিসেবে আমার অধিকার সুনিশ্চিত করতে না পারার ব্যাথাটা মেনে নেওয়া সবচেয়ে কষ্টকর।

আমি আমার বাচ্চার ভাল মা ও তত্বাবধায়ক হবার আপ্রাণ চেষ্টা করেছি। আমি জানি যে আমি আরও অনেক ভালভাবে এ কাজ করতে পারতাম যদি প্রসব পরবর্তী অভিজ্ঞতা আমার গর্ভাবস্থার মতোই মসৃণ হত। এটা দুর্ভাগ্যপূর্ণ যে মায়েরা তাঁদের ইচ্ছানুযায়ী সন্তানের জন্ম দিতে পারে না। এটা আরও দুর্ভাগ্যপূর্ণ যে জন্ম দেবার অধিকার একটা তামাসার ব্যাপার, এমনকি আজকের দিনেও।

এই জন্মদানের কাহিনিটি ভারতীয় জন্মদান প্রকল্পের একটি অংশরূপে মীনাক্ষী আয়ার শেয়ার করেছেন। ভারতীয় জন্মদান প্রকল্পে নানা ব্যক্তি থেকে পাওয়া জন্মদান সম্পর্কিত কাহিনীগুচ্ছ ক্রমিক পর্যায়ে দেওয়া হয়েছে, যাতে শিশু জন্ম দেবার নানা অসঙ্গতি, নানা চড়াই- উৎরাই তুলে ধরা হয়। আপনার কাহিনী পাঠাবার জন্য [email protected] এ ইমেল করুন।